আজ ৬ই বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১৯শে এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ


সংবিধান থেকেই সংকট সমাধানের উপায় দেবে বিএনপি

(আজকের দিনকাল):নির্বাচনকালীন সরকার ইস্যুতে রাজনীতি এখন উত্তপ্ত। এ ইস্যুতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির অবস্থান পুরোপুরি বিপরীতমুখী। ক্ষমতাসীনরা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, দলীয় সরকারের অধীনেই হবে আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন। দেশে কোনোদিন আর নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার আসবে না। বর্তমান সংবিধানের আলোকেই হবে সবকিছু। এর বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। অন্যদিকে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বিএনপি। এমনকি সেই নির্বাচন প্রতিহত করা হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

এমন পরিস্থিতিতে এবার সংবিধানের ভেতর থেকেই সংকট সমাধানের উপায় তুলে ধরার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটির হাইকমান্ড। আজ রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে এ বিষয়ে একটি সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছে।

বিএনপির নীতিনির্ধারক ও আইনজীবী নেতারা জানান, সেমিনারে সংবিধানে নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার সংযোজনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হবে। ১৯৯৬ সালে যে পরিস্থিতিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয় বর্তমানে সেই প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি। সেই বিষয়টি বিস্তারিত আলোচনায় আসবে। এছাড়া নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে চূড়ান্ত আন্দোলনে যাচ্ছে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো। আগামী নির্বাচন নিয়ে বিদেশিরাও বেশ তৎপর। এমন পরিস্থিতিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয়টি ফের আলোচনায় আনতে চান তারা।

তারা বলেন, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে আন্দোলন করে। সাধারণ মানুষের মধ্যেও এ দাবি জোরালো হয়। সবকিছু বিবেচনা করে সেই সময়ের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনের সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ সংসদ থেকে পদত্যাগ করায় এবং সেই সংসদে তা পাশ করা সম্ভব হয়নি। পরে শুধু তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার জন্য ১৫ ফেব্রুয়ারি একটি নির্বাচন করা হয়। ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হয়ে ১৯৯৬ সালের ২৭ মার্চ নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তনে সংবিধানের এয়োদশ সংশোধনী পাশ করে। এরপর বিএনপি সরকার সংসদ ভেঙে দিয়ে পদত্যাগ করে। ৯৬ সালের চেয়ে বর্তমানেও নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আরও জোরালো হয়েছে।

দেশের প্রতিটি মানুষ এমনকি বেশিরভাগ রাজনৈতিক দল মনে করে দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়। জনগণ ও দেশের দিকে তাকিয়ে বিএনপি যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বর্তমান প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ সরকার একই সিদ্ধান্ত নেবে বলে আমরা বিশ্বাস করি। সরকার চাইলে ১৯৯৬ সালে সংবিধানে সংযোজিত ধারা ৫৮-খ, গ ও ঘ এর আলোকে দলনিরপেক্ষ একটি অন্তর্র্বর্তীকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংবিধানে সংযোজন করতে পারে। সংসদে আওয়ামী লীগ সরকারের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় সহজেই এ বিধান সংযোজন করা সম্ভব।

বিএনপি নেতারা বলেন, আজকের সেমিনারে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী নিয়েও আইনি দিক তুলে ধরা হবে। ২০১১ সালে সুপ্রিমকোর্টের রায়ের পরিপ্রক্ষিতে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান বাতিল করে আওয়ামী লীগ সরকার। তবে ওই রায়ে আগামী দুটি সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতে পারে বলে মত দেন আদালত। তবে এক্ষেত্রে বিচারপতিদের এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত না করতে বলা হয়। ওই সময়ে আদালতে যারা অ্যামিকাস কিউরি ছিলেন তাদের বেশিরভাগই তত্ত্বাবধায়ক সরকার আরও দুই মেয়াদে রাখার পক্ষে মত দেন। আওয়ামী লীগ সরকার তড়িঘড়ি সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলোপ করে। উচ্চ আদালতের রায় ও পর্যবেক্ষণকে পাশ কাটিয়ে এ সংশোধনী আনা হয়। যা আইনের দৃষ্টিতে সঠিক হয়নি। তাছাড়া অবসরে যাওয়ার এতদিন পর রায় প্রকাশ করতে পারেন কিনা সেই যুক্তিও তুলে ধরা হবে।

জানতে চাইলে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও আইনজীবী ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন বলেন, পূর্ণাঙ্গ রায় অনুযায়ী দুটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন যেহেতু তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত হয়নি, তাই আগামী দুটি সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হতেই পারে। এ বিষয়ে সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সমঝোতার মাধ্যমে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সরকার ও বিরোধী দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণের নজির এ দেশে আছে। ১৯৯০ সালের ডিসেম্বরে গণআন্দোলনে তৎকালীন সরকারের পতন হলে নির্বাচন কার অধীনে হবে এ নিয়ে সংকট দেখা দেয়।

তখন সব দল মিলে একটি অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে নির্বাচনের সিদ্ধান্ত নেয়। ওই সময়ের প্রধান বিচারপতিকে সেই সরকারের প্রধান করা হয়। যা সংবিধানে ছিল না। পরে ১৯৯১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনের পর অন্তর্বর্তী সরকারকে সংবিধানে বৈধতা দেওয়া হয়। তাই রাজনৈতিক দলগুলোর সদিচ্ছা থাকলে আলোচনায় বসে আগামীতে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে সমঝোতায় পৌঁছানো সম্ভব।

জানতে চাইলে বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক ও আইনজীবী নেতা অ্যাডভোকেট মাসুদ আহমেদ তালুকদার  বলেন, সংবিধানে এখন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিধান নেই। সংবিধানে আর্টিকেল ৭-এ বলা আছে, জনগণের ইচ্ছা অথবা অভিপ্রায় হলো আইনের মূল স্রোত। জনগণ আজকে যা ভাবে আগামীকাল সেটাই দেশের আইন। এই জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করেন রাজনীতিবিদরা। রাজনৈতিক দল হলো জনগণের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান। ৯১ সালে আর্টিকেল ৭ অনুযায়ী ওই সময় জনগণ মনে করেছে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হওয়া দরকার। যেহেতু জনগণকে প্রতিনিধিত্ব করে রাজনৈতিক দল। তারা একটা সমঝোতায় উপনীত হয়। যদিও সেটা সংবিধানে ছিল না। অর্থাৎ তত্ত্বাবধায়ক সরকার আগে ক্ষমতায় বসলেন, আর আইন হলো পরে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করার পরেও আর্টিকেল ৭-এর মধ্যেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার আছে। কারণ জনগণ যা ভাবে সেটাই হলো আগামী দিনে দেশের আইন।

তিনি বলেন, সংসদে যদি মেজোরিটি থাকে, এবং সরকার যদি মনে করে যে কোনো আইন যে কোনো সময় সংবিধানে সন্নিবেশিত করা সম্ভব। যে আইন বাতিল করেছে, সে আইন নতুন করে তৈরিও করতে পারে। এখানে আইনের কোনো বাধা নেই। আরেকটা হচ্ছে আওয়ামী লীগ যদি মনে করে এবসুলেট মেজোরিটি থাকার পরও তত্ত্বাবধায়ক আনব না, রাজনৈতিক পরাজয় হতে পারে, তাহলে তারা পদত্যাগ করে রাষ্ট্রপতিকে দিয়ে আবার তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে। পরবর্তী অধিবেশনে আইনে পরিণত হবে।

বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করে আদালতের দেওয়া রায়টিই ছিল অনৈতিক এবং ন্যায়বিচারের পরিপন্থি। তাছাড়া রায়ের পুরো প্রতিফলন পঞ্চদশ সংশোধনীতে হয়নি। সরকার তাদের সুবিধামতো এটা করেছে।

Share

এ ক্যাটাগরীর আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এ ক্যাটাগরীর আরো সংবাদ