আজ ৮ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ, ২১শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ


দুদলের নেতাদের ঈদযাত্রা,নির্বাচন ও আন্দোলনের বার্তা যাচ্ছে তৃণমূলে

(আজকের দিনকাল):দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে সবশেষ ঈদ। পবিত্র ঈদুল আজহাকে কাজে লাগানোর জন্য হাইকমান্ডের গুরুত্বপূর্ণ বার্তা নিয়ে তৃণমূলে যাচ্ছেন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতারা। নির্বাচনের প্রস্তুতির অংশ হিসাবে ভোটারদের কাছে যাওয়ার নির্দেশনা দিয়েছে আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে সরকার পতনের একদফার বার্তা নিয়ে তৃণমূলে যাচ্ছেন বিএনপি নেতারা। দুই দলের নেতাদের উপস্থিতিতে এবার জমে উঠবে ঈদকেন্দ্রিক তৃণমূলের রাজনীতি।

ভোটারদের কাছে যেতে আ.লীগের নির্দেশনা

সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী বছরের শুরুর দিকে অনুষ্ঠিত হবে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ফলে ভোটের আগে এটাই হতে যাচ্ছে শেষ ঈদ। ঈদ রাজনীতিতে গণসংযোগ, নির্বাচনের প্রস্তুতি এবং বিরোধীদের আন্দোলন মোকাবিলার প্রস্তুতি এগিয়ে রাখতে চায় আওয়ামী লীগ। সরকারি দলের বেশির ভাগ এমপিই নিজ এলাকায় অবস্থান করবেন। ঈদ ঘিরে রাজনীতির মাঠে সক্রিয় দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশীরাও। স্থানীয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের সঙ্গে ঈদ উদ্যাপন করবেন তারাও। একই সঙ্গে চলবে নির্বাচনি প্রচারণা। সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরবেন জনগণের সামনে। আওয়ামী লীগ নেতারা বলছেন, এবারের ঈদে নির্বাচনি আমেজ থাকবে। দলের নেতাকর্মী, সংসদ-সদস্য ও মনোনয়নপ্রত্যাশীদের জনগণের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে গণসংযোগ করতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে দলীয় সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৈশ্বিক সংকটের কথা মাথায় রেখে নেতাকর্মীদের অসহায় মানুষের পাশে থাকার নির্দেশনা দিয়েছেন।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য লে. কর্নেল (অব.) মুহাম্মদ ফারুক খান  বলেন, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা সব সময় তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী দেশের মানুষের পাশে ছিল, আছে এবং থাকবে। বিশ্বে অর্থনৈতিক একটা সংকট চলছে এবং এর প্রভাব কিছুটা বাংলাদেশেও পড়েছে। এছাড়া সামনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ফলে এবার আমরা আরও বেশি করে জনগণের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছি। যাতে সবার ঈদ আরও সুন্দর ও স্বস্তিতে হয়। বিএনপির আন্দোলনের হুঁশিয়ারি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এগুলো নিয়ে আমরা চিন্তিত নই। আমরা জনগণকে সতর্ক করছি। নিজেদের সাংগঠনিক তৎপরতাকে আরও জোরদার করার চেষ্টা চলছে। এ বিষয়ে আমাদের দলীয় সভাপতি আমাদের দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।

আওয়ামী লীগের সম্পাদকমণ্ডলীর এক সদস্য বলেন, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই হবে। সব দলই নির্বাচনে অংশ নেবে-এমনটি ধরে নিয়েই আমরা প্রচারে নেমে পড়েছি। করোনার সময় থেকে আমরা সাধারণ মানুষের পাশে আছি। রমজানেও ইফতার পার্টি না করে নানাভাবে সাধারণ মানুষের পাশে ছিল আওয়ামী লীগ। ঈদের সময় রাজনীতি আরও বেশি সরগরম হয়। এখন এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নির্বাচনি আমেজ। ফলে এবার ভিন্নমাত্রা যোগ হচ্ছে। তবে আবার বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের বিষয়টিও রয়েছে। সব বিষয় মাথায় রেখেই আমাদের দলের নেতাকর্মীদের দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, আওয়ামী লীগের অনেক নেতা ইতোমধ্যে সাধারণ মানুষের সঙ্গে ঈদ করতে ঢাকা ছেড়েছেন। সংসদ অধিবেশন চলার কারণে মন্ত্রী-এমপিদের মধ্যে যারা ঢাকায় ছিলেন, তারাও সোমবার অধিবেশন মুলতুবি হওয়ার পর বিকালের পর থেকেই ছুটেছেন নির্বাচনি এলাকায়। কেন্দ্রীয় নেতা ও মন্ত্রীদের অনেকেই ইতোমধ্যে নিজ নির্বাচনি এলাকায় কয়েক দফা ঘুরে এসেছেন। দলীয় নেতাকর্মীদের পাঞ্জাবি-পাজামা, শাড়িসহ উপহারসামগ্রী দিচ্ছেন। পাশাপাশি গরিব-দুঃখীদের মধ্যে ঈদসামগ্রী বিতরণসহ কুরবানির ব্যবস্থা করে এসেছেন। অনেকেই নিজ এলাকায় ঈদের নামাজ পড়বেন এবং স্থানীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে এবার ঈদ উদ্যাপন করবেন। ঈদের পর আবারও এলাকায় যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে অনেকের।

আওয়ামী লীগ নেতারা বলেন, ঈদ ছাড়াও অন্যান্য উৎসবেও জনগণের সঙ্গে আওয়ামী লীগের একাত্মতা ও সহযোগিতা থাকে। কুরবানি ঈদেও অসহায় মানুষের পাশে নানাভাবে যুক্ত থাকার জন্য দলের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা আছে। একটি মানুষও যেন ঈদ আনন্দ থেকে বঞ্চিত না হন, সেজন্য সভাপতি হিসাবে দলের নেতাদের এবং প্রধানমন্ত্রী হিসাবে স্থানীয় প্রশাসনকেও নির্দেশনা দিয়েছেন বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে এসব মেলবন্ধনে সরকারের উন্নয়ন এবং বিএনপি-জামায়াত সময়ের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড প্রচারেরও নির্দেশনা রয়েছে।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম কামাল হোসেন বলেন, আমাদের নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দেওয়া আছে-এই ঈদে যারা অসহায়, দুস্থ মানুষ, তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর। তৃণমূলের নেতাকর্মীদের খোঁজখবর নেওয়া, তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করার জন্য বলা হয়েছে। সবাই যেন ঐক্যবদ্ধ থাকে, এটাই আমাদের মূল লক্ষ্য।

এ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও জাতীয় সংসদের হুইপ আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন বলেন, এবারের ঈদে নির্বাচনি আমেজ থাকবে। সব মনোনয়নপ্রত্যাশী ঈদ শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন। আমাদের নেতাকর্মী ভাইবোনদের জনগণের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে গণসংযোগ বিনিময় করতে অনুরোধ জানানো হয়েছে।

একদফার বার্তা নিয়ে যাচ্ছে বিএনপি

সরকারবিরোধী আন্দোলনের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে বিএনপি। আগামী মাসেই ঘোষণা হতে পারে সরকার পতনের একদফা। সেই আন্দোলনে ‘অলআউট’ রাজপথে নামতে সব ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে বিএনপি। একদফা আন্দোলনের সেই বার্তা তৃণমূলে পৌঁছানোর নির্দেশ দিয়েছে হাইকমান্ড। এজন্য পবিত্র ঈদুল আজহায় সব নেতাকে নিজ নিজ এলাকায় অবস্থান করতে বলা হয়েছে। ইতোমধ্যে অনেকেই এলাকায় অবস্থান করছেন। ঈদের আগে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন কেউ কেউ।

ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় শেষে নেতাদের দ্রুত ঢাকায় ফেরার নির্দেশও দিয়েছে হাইকমান্ড।

বিএনপির দুজন নীতিনির্ধারক বলেন, সরকারবিরোধী চূড়ান্ত আন্দোলনের আগে এটাই সবশেষ ঈদ। পবিত্র ঈদুল আজহায় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ নাড়ির টানে নিজ নিজ এলাকায় যান। দলীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে সরকারবিরোধী আন্দোলনে যুক্ত করতে এ ঈদকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই কেন্দ্রীয় নেতাদের নিজ নিজ এলাকায় গিয়ে দলীয় নেতাকর্মী ছাড়াও সাধারণ মানুষের সঙ্গে ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় করতে বলা হয়েছে। এছাড়া বিগত আন্দোলন-সংগ্রামে যেসব নেতাকর্মী আহত হয়েছেন, যারা এখনো কারাগারে আছেন, তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর নির্দেশ রয়েছে।

জানতে চাইলে বিএনপির যুগ্মমহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, শিগগিরই সরকার পতনের একদফা ঘোষণা করা হবে। সেই আন্দোলনে দলীয় নেতাকর্মীর পাশাপাশি সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে রাজপথে নামানোর পরিকল্পনা রয়েছে। সেই বার্তা নিয়ে এবারের ঈদে সব নেতাকে নিজ নিজ এলাকায় যাওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। ইতোমধ্যে তিনি নিজ এলাকা বরিশালে অবস্থান করছেন।

বিএনপির নীতিনির্ধারকরা জানান, সরকারবিরোধী আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছি। সরকারের পদত্যাগই এখন একমাত্র লক্ষ্য। তাই ১০ দফাকে একদফায় রূপ দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে সমমনা দলগুলোর পরামর্শ নিয়ে স্থায়ী কমিটির কয়েকটি বৈঠকে এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। কিছু দাবিসংবলিত একদফা চূড়ান্ত করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে সরকারের পদত্যাগ ও বিদ্যমান সংসদ বিলুপ্তি, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করে তার অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ সব রাজবন্দির মুক্তি, মিথ্যা-গায়েবি মামলা প্রত্যাহার, ইসি পুনর্গঠন, সংবিধান ও রাষ্ট্রব্যবস্থার গণতান্ত্রিক সংস্কারের মাধ্যমে জনগণের অর্থনৈতিক মুক্তি এবং ভোটাধিকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা।

সূত্র জানায়, শুরুতে শান্তিপূর্ণ কর্মসূচির মধ্য দিয়েই শুরু হবে একদফার আন্দোলন। এর মধ্যে থাকতে পারে গণসমাবেশ, বিক্ষোভ মিছিল, পদযাত্রা ও গণ-অবস্থান। এরপর সময় ও সুযোগ বিবেচনায় ঘোষণা করা হবে কঠোর কর্মসূচি। সেক্ষেত্রে ঢাকা ঘেরাও, ঢাকায় অবস্থানের মতো কর্মসূচি রয়েছে তাদের পরিকল্পনায়। সরকার পতনের চূড়ান্ত আন্দোলনে দলের সাংগঠনিক শক্তি যাচাইয়ে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করে আসছে বিএনপি। কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত পালন করা হয় এসব কর্মসূচি। আগামী দিনের আন্দোলনে ছাত্রদল, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দলসহ অঙ্গসংগঠনকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তাদের সাংগঠনিক শক্তি যাচাইয়ে সারা দেশে তারুণ্যের সমাবেশ করছে দলটি। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম, বগুড়া ও বরিশালে শেষ হয়েছে এ কর্মসূচি। ঈদের পর আরও কয়েকটি বিভাগীয় শহরে একই কর্মসূচি পালন করা হবে। সরকারবিরোধী আন্দোলনের মোমেন্টাম তৈরিতে ঈদের পর আরও কিছু কর্মসূচি পালন করবে দল। শ্রমিক দল, কৃষক দল ও মৎস্যজীবী দলের উদ্যোগে পদযাত্রা করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

জানতে চাইলে বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু জানান, নানা প্রতিকূলতার পরও নিজ এলাকা নাটোরে ঈদ উদ্যাপন করবেন। আগামী দিনের আন্দোলনে নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে উদ্বুব্ধ করার লক্ষ্যে কাজ চলছে।

বিএনপির প্রচার সম্পাদক ও লক্ষ্মীপুর জেলার আহ্বায়ক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি  বলেন, সরকার পতনের চূড়ান্ত আন্দোলনের দ্বারপ্রান্তে বিএনপি। এবারের আন্দোলনে জয়ের বিকল্প ভাবছি না আমরা। সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এ সরকারের পতন ঘটিয়ে দেশে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নিশ্চিত করা হবে। সেই আন্দোলনে যাতে সবাই অংশ নেয়, সেই লক্ষ্যে আমরা কাজ করছি। হাইকমান্ডের নির্দেশে আমি ইতোমধ্যে নিজ এলাকায় অবস্থান করছি। নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময়ও করেছি। ঈদের দিন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করব।-যুগান্তর

Share

এ ক্যাটাগরীর আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এ ক্যাটাগরীর আরো সংবাদ