আজ ৮ই ফাল্গুন, ১৪৩০ বঙ্গাব্দ, ২১শে ফেব্রুয়ারি, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ


ক্রয় খাতে ব্যাপক দুর্নীতির অনুসন্ধান শুরু

(আজকের দিনকাল):রাজশাহী মহানগর পুলিশে (আরএমপি) কেনাকাটা, পণ্য ও সেবা সংগ্রহসহ বিভিন্ন ক্রয় খাতে ব্যাপক দুর্নীতি-অনিয়মের অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। রাজশাহী সমন্বিত দুদক কার্যালয় থেকে ২৫ জুন সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন খাতের নথিপত্র চেয়ে আরএমপি পুলিশ কমিশনারকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। রাজশাহী মহানগর পুলিশের প্রধান সহকারী (প্রশাসন) জুলমাত হাবীবসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন খাতের কোটি কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ করা হয়েছে।

জানা গেছে, সম্প্রতি ১৩ পৃষ্ঠার অভিযোগনামা জমা হয় দুর্নীতি দমন কমিশনে। যাচাই-বাছাই শেষে সদর দপ্তর থেকে অনুসন্ধানের জন্য পাঠানো হয় দুদকের রাজশাহী জেলা কার্যালয়ে। রাজশাহী দুদকের উপসহকারী পরিচালক (ডিএডি) সাজ্জাদ হোসেনকে অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছে।

অভিযোগ অনুসন্ধানের বিষয়টি নিশ্চিত করে রাজশাহী সমন্বিত দুদক কার্যালয়ের উপপরিচালক (ডিডি) মোহা. মনিরুজ্জামান বলেন, আরএমপির অভ্যন্তরীণ কেনাকাটা ছাড়াও বিভিন্ন পণ্য ও সেবা সংগ্রহ, নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি বাণিজ্যের মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার একটি অভিযোগ দুদক অনুসন্ধান করছে।

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে-নির্মাণ, মেরামত সংস্কার, যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদি কেনা ও মেরামত, আসবাবপত্র, কম্পিউটার, মোটরযানের যন্ত্রাংশ ক্রয় ও মেরামত, মনোহরীসামগ্রী ক্রয়, পুলিশের পোশাক, পুলিশ হাসপাতালের ওষুধপথ্য সরবরাহ, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে জনবল নিয়োগ, গাড়ি ভাড়া ও প্রশিক্ষণসামগ্রী কেনাসহ ১৭টি খাতে টেন্ডার করা হয়। নিয়মানুযায়ী এসব পণ্য ও সেবা ক্রয় করার কথা আরএমপির লজিস্টিক ও ইঅ্যান্ডডি বিভাগের। তবে কমিশনারদের আস্থাভাজন হওয়ায় হাবীবই এসব নিয়ন্ত্রণ করে আসছেন।

অভিযোগ মতে, ২০১৯ সাল থেকে আরএমপিতে যত টেন্ডার হয়েছে তার সিংহভাগই দেওয়া হয়েছে জুলমাত হাবীবের ব্যবসায়িক অংশীদার ঠিকাদার আব্দুর রহমান মুন্না ও তার আত্মীয়স্বজনের নামে থাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে। হাবীব নেপথ্যে এসব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ করেন। ক্ষেত্র বিশেষে কোনো কাজ না করেই তুলে নিয়েছেন মোটা অঙ্কের বিল। অভিযোগে বলা হয়েছে, এভাবেই জুলমাত হাবীব রাজশাহী নগরীর মহিষবাথান এলাকায় দুই কোটি টাকা মূল্যের তিনতলা বাড়ি ছাড়াও বসুয়া এলাকায় নিজের ও স্ত্রীর নামে ৬টি প্লট ও দুটি ফ্ল্যাট কিনেছেন। নিজ এলাকা চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে ২ কোটি টাকায় ১০ কাঠা জমি এবং আড়াই কোটি টাকায় ১০ বিঘা জমি কিনেছেন। নামে-বেনামে হাবীব এখন ১০ কোটি টাকার মালিক বলে অভিযোগে বলা হয়েছে।

অভিযোগ বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১৯ থেকে ২০২২ পর্যন্ত পুলিশের বিভিন্ন স্থাপনা মেরামত ও সংস্কার কাজের ৪৪টি টেন্ডার ও কোটেশন হয়। লাবীব এন্টারপ্রাইজ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে জুলমাত হাবীব এসব কাজ করান। মাত্র ৩৫ ভাগ কাজ সম্পন্ন করে তুলে নেওয়া হয় কয়েক কোটি টাকার বিল। একইভাবে ও একই সময়ে যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সরঞ্জাম মেরামতে ৪ কোটি টাকা টেন্ডার কোটেশন করা হয়। জুলমাত হাবীব সেই একই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান লাবীব এন্টারপ্রাইজকে দিয়ে কাজগুলো করান। এক্ষেত্রে বাজারদরের চেয়ে দ্বিগুণে কাজ করান। ৩২ হাজার টাকার টেলিভিশন কেনা হয় ১ লাখ টাকা দিয়ে। ৪ হাজার টাকার সিসি ক্যামেরা ঠিকাদার মুন্নার কাছ থেকে কেনা হয় ৪০ হাজার টাকায়। দুই লাখ টাকার জেনারেটর কিনে ঠিকাদারকে ৬ লাখ টাকার বিল দেওয়া হয়। ৭০ হাজার টাকার এসি কিনে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা বিল দেওয়া হয়েছে। ৫টি ঘাস কাটার মেশিন ক্রয় দেখানো হলেও বাস্তবে একটিও কেনা হয়নি। যদিও লাবীব এন্টারপ্রাইজের মালিক মুন্না এসব অভিযোগ মিথ্যা বলে দাবি করেছেন।

এদিকে একই সময়ে ৪১ লাখ টাকার যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম ক্রয় দেখিয়ে ঠিকাদারকে বিল পরিশোধ দেখানো হয়েছে। ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশে ভুয়া বিল ভাউচার তৈরি করে এসব অর্থ জুলমাত হাবীব, ঠিকাদার মুন্না ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ভাগ-বাটোয়ারা করেন বলে অভিযোগ। রাজশাহী পুলিশ হাসপাতালের জন্য ৫ কোটি ৯০ লাখ টাকা বিল করে ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশে পুরো ওষুধ ও সরঞ্জামাদি সরবরাহ না নিয়ে সিংহভাগ টাকা লোপাট করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী জুলমাত হাবীব ঠিকাদারের সঙ্গে যোগসাজশ করে রিএজেন্ট সরবরাহ না নিয়েই বিল পরিশোধ করেন। টেন্ডার বা কোটেশনের মাধ্যমে মেডিকেল রিএজেন্ট বা ওষুধ কেনার নিয়ম থাকলেও কেনা দেখানো হয়েছে অনিয়মিতভাবে। ২০২২ সালের জুনে ৯ লাখ টাকার ওষুধ কেনার বিল উত্তোলন করা হলেও বাস্তবে কোনো ওষুধই নেওয়া হয়নি।

অন্যদিকে ২০২০ থেকে ২০২২ বছরে টেন্ডারে কোর-আই ৭ কম্পিউটার কেনার কথা শিডিউলে উল্লেখ করা হলেও নেওয়া হয়েছে কোর-আই ৫। কম্পিউটার ক্রয় খাতে ১ কোটি ৩০ লাখ টাকার বিল পরিশোধ করা হয়েছে। ২০২০ থেকে ২০২২ পর্যন্ত কম্পিউটারসামগ্রী ও কালি ক্রয় খাতে ৫৭ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়েছে। বাস্তবে এসব সামগ্রী পুরোপুরি না কিনে ৩৫ লাখ টাকা লোপাট করা হয়েছে। তিন বছরে কম্পিউটার মেরামত খাতে ৮৫ লাখ টাকার বিল পরিশোধ হলেও বাস্তবে সামান্য কাজ করে পুরো টাকা লোপাট হয়েছে। ২০২০ থেকে ২০২২ বছরে ১ কোটি ৫ লাখ টাকার মনোহরীসামগ্রী ক্রয় দেখানো হলেও সিংহভাগ অর্থই লোপাট হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। এ সময়ে ডি-স্টোরের জন্য ২ কোটি ২৫ লাখ টাকার মালামাল ক্রয় দেখানো হয়েছে। যদিও বাস্তবে তা ক্রয় না দেখিয়ে রেজিস্টারে জমা দেখানো হয়েছে। যে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে পণ্যাদি ক্রয় দেখিয়ে বিল করা হয় সেসব ঠিকাদারকে শতকরা ৮ ভাগ কমিশন দিয়ে ম্যানেজ করেন জুলমাত হাবীব। বাস্তবে জুলমাত হাবীব নিজেই এসব মালামাল ক্রয় করেন এবং বিভিন্ন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নামে বিলের চেক ইস্যু করেন। বিল উঠে গেলে অগ্রিম নেওয়া চেকের মাধ্যমে হাবীব সেই টাকা উত্তোলন করেছেন।

অভিযোগে আরও জানা গেছে, খেলার সামগ্রী ক্রয় খাতে ২৭ লাখ টাকা, প্রশিক্ষণ খাতে ১৮ লাখ, বইপত্র ক্রয় খাতে ৭ লাখ, গাড়ি ভাড়া খাতে ২ কোটি ৫০ লাখ টাকার সিংহভাগ লোপাটের অভিযোগ করা হয়েছে। জানা গেছে, আরএমপির বিভিন্ন পার্টির টহল পরিচালনা খাতে নিয়মিত গাড়ি ভাড়া নেওয়া দেখানো হলেও বাস্তবে টহল পুলিশের দল হিউম্যান হলার জাতীয় গাড়ি ব্যবহার করে। ঠিকাদারি লাইসেন্স দেখিয়ে জুলমাত হাবীব এ খাত থেকে বিপুল টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এছাড়া আউটসোর্সিংয়ে জনবল নিয়োগে প্রতিজনের কাছ থেকে কমিশনারের নামে ২ লাখ টাকা করে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

অভিযোগে বলা হয়, জুলমাত হাবীব প্রশাসন বিভাগের প্রধান সহকারী হলেও সাবেক কয়েকজন কমিশনারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে অলিখিতভাবে আরএমপির সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেছেন। এ সুবাদে বিভিন্ন থানার ওসি পদায়ন থেকে শুরু করে পদোন্নতি ও বদলির মাধ্যমে হাতিয়েছেন বিপুল অর্থ। অভিযোগ রয়েছে, এসব অর্থ জুলমাত হাবীবের মাধ্যমে আরএমপির প্রভাবশালী কর্মকর্তাদেরও পকেটে গেছে।

জানতে চাইলে অভিযোগ অস্বীকার করে আরএমপির প্রধান সহকারী জুলমাত হাবীব বলেন, কেউ শক্রতামূলকভাবে এসব অভিযোগে করেছেন। তিনি অবৈধভাবে কোনো টাকা উপার্জন করেননি। আরএমপিতে তিনি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের আদেশ নির্বাহ করেন মাত্র। বিপুল পরিমাণ জমি ও প্লট কেনার অভিযোগ সঠিক নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।-যুগান্তর

Share

এ ক্যাটাগরীর আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এ ক্যাটাগরীর আরো সংবাদ