আজ ৬ই বৈশাখ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ১৯শে এপ্রিল, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ


জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতির উদ্যোগ

ঐতিহ্যবাহী ধুছনি দইয়ের চাহিদা বাড়ছে

(আজকের দিনকাল):দুই থেকে তিন যুগের বেশি সময় ধরে গৌরাঙ্গ দাসের (৫৪) পরিবার মাটির হাঁড়ির পাশাপাশি ঝুড়িতে (ধুছনি) দই পাতেন। পারিবারিক ঐতিহ্য হিসেবে ধুছনি দইয়ের গুণমানও বজায় রেখেছেন তারা। স্থানীয়ভাবে বিয়েসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে হাঁড়ির দইয়ের পাশাপাশি এগুলো কেনেন অনেকে। ভিন্ন স্বাদের এই ধুছনি দইয়ের আঁতুড়ঘর মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার বর্নি ইউনিয়নের মিহারী গ্রামে। এটি তৈরি করা হয় গরু ও মহিষের দুধে। গোলগাল পাত্রটিও ভিন্ন ধাঁচের, বাঁশের তৈরি ঝুড়ি, যা ‘ধুছনি’ নামে পরিচিত।

সরেজমিন বড়লেখার বর্নি ইউনিয়নের মিহারী গ্রামের গৌরাঙ্গ দাসের বাড়িতে দেখা গেছে বাঁশ-বেতের তৈরি ছোট ঝুড়ি, যা ধুছনি নামে পরিচিত। সেই ধুছনির গায়ে ক্ষীরের মতো ময়দার প্রলেপ মাখিয়ে ছিদ্রগুলো বন্ধ করে দিচ্ছেন এক নারী। তারপর সেই ধুছনিতে মহিষের দুধ ঢেলে দই পাতা হচ্ছে।

গৌরাঙ্গ দাস বলেন, ‘আগে বাপ-দাদা তৈরি করেছেন। এটা একবারে অরিজিনাল দুধের দই। অন্য কিছুই মিশাই না। হাওর এলাকায় মহিষের দুধ মিলে। আমরা নিজের হাতে বানাই। কাত করলেও পড়ে না। গরুর দুধ দিয়েও করি। যার চাহিদা যেটা, সেটা নেয়।’ তিনি আরো জানান, এটা তাদের পারিবারিক ব্যবসা। তাদের গ্রামটি হাকালুকি হাওরের পারে। হাওরে ঘাস, শালুকসহ নানা জলজ উদ্ভিদের প্রাচুর্য থাকায় অনেকেই গরু-মহিষ পালন করেন। এখনো হাওরপারের এলাকাটিতে গরু-মহিষের নির্ভেজাল দুধ পাওয়া যায়। তারাও বাপ-দাদার পেশা ধরে আছেন। পাত্রের পরিচয় ও স্বাদের ভিন্নতায় এই দইয়ের আলাদা কদর রয়েছে। পাত্রটি বানানো হয় বাঁশ-বেত দিয়ে। এরও আলাদা কারিগর আছেন, তারা চাহিদামতো বানিয়ে দেন। ধুছনিতে পাতা হয় বলে এর পরিচিতিও হয়েছে ‘ধুছনির দই’ নামে। তবে শুধু পাত্রের নামেই এর বৈশিষ্ট্য ভিন্ন হয়নি। খাঁটি দুধ দিয়ে তৈরি হয় বলে স্বাদেও ভিন্নতা আছে। কারও চাহিদা না থাকলে এর মধ্যে চিনি বা অন্য কিছু মেশানো হয় না। দুই ও পাঁচ কেজি ওজনের ধুছনিতে দই বসানো হয়। প্রতি কেজি দইয়ের দাম ৩০০ টাকা। প্রায় প্রতিদিনই কিছু না কিছু দইয়ের চাহিদা (অর্ডার) থাকে। কারও ঠিকানায় পৌঁঁছে দিতে হয়, আবার কেউ এসে বাড়ি থেকে নিয়ে যান। প্রতিদিন স্থানীয়ভাবে গরু-মহিষের মালিকের কাছ থেকে তারা দুধ সংগ্রহ করেন।

বিয়ে বা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এক মণ বা তারও বেশি চাহিদা থাকে। তখন বাইরে থেকে দুধ সংগ্রহ করতে হয়। হাকালুকি হাওরপারে ‘আবাদি’ বলে একটি বাজারে সকালবেলা দুধের হাট বসে। স্থানীয় গরু-মহিষের মালিক সেই হাটে টাটকা দুধ নিয়ে আসেন। সেই হাট থেকে তারা দুধ কেনেন। বড়লেখা ছাড়াও মৌলভীবাজারের জুড়ী, সিলেট ও সিলেটের গোলাপগঞ্জে এই দইয়ের চাহিদা আছে।

এই ধুছনি তৈরি করেন বর্নির মিহারী-নওয়াগ্রামের বাসন্তি রানী দাস। তিনি বলেন, ‘আমি ও আমার বিধবা পুত্রবধূ (সবিতা রানী দাস) ধুছনি বানাই। বাপের বাড়িতে স্কুলে পড়ার সময় বেত-বাঁশের কিছু কাজ শিখেছিলাম। এখন এটা দিয়াই সংসার চালাই।’ তিনি বলেন, এলাকায় বাঁশ-বেতের কাজ দু-একটি পরিবার করে থাকে, তবে ওজন-মাপ ঠিক রেখে এই ধুছনি তারাই বানান। একটি ধুছনির দাম পড়ে ৪০ টাকা।

বর্নি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান জয়নাল আবেদীন বলেন, অনেক দিন ধরে তারা এই দই খান। মহিষের দুধ ঘন হয়, তাই এই দুধের স্বাদ আলাদা। স্থানীয়ভাবে ধুছনির দইয়েরই চাহিদা বেশি। বড়লেখা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুনজিত কুমার চন্দ বলেন, এই পণ্য যাতে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়, আমরা সে উদ্যোগ নিচ্ছি।

Share

এ ক্যাটাগরীর আরো সংবাদ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এ ক্যাটাগরীর আরো সংবাদ