আজ ৯ই শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ২৪শে জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

রোজা বিভিন্ন যুগে ও ধর্মে

মুহাম্মদ মনজুর হোসেন খান,(আজকের দিনকাল):
আদম (আ.) থেকে নূহ (আ.) পর্যন্ত প্রতি চান্দ্র মাসের ১৩, ১৪, ১৫ তারিখে সিয়াম ফরজ ছিল। ইহুদিদের প্রতি সপ্তাহে শনিবার, বৎসরে মহররমের ১০ তারিখে এবং মুসা (আ.)-এর তুর পাহাড়ে তাওরাত পাওয়ার আগে দীর্ঘ চল্লিশ দিন একাধিকক্রমে সিয়াম পালনরত অবস্থানের স্মৃতি স্মরণে চল্লিশ দিন সিয়াম পালনের নির্দেশ আসে।

ঈসা (আ.) ইঞ্জিল পাওয়ার আগে দীর্ঘ চল্লিশ দিন সিয়াম পালন করেছিলেন। নিউ টেস্টামেন্টে উল্লেখ আছে, ‘And when he (Jesus) had fasted forty days and forty night, he was afterward unhugered’ (Mathew-4:2)।

দাউদ (আ.) একদিন পর পর সিয়াম রাখতেন (বোখারি, মুসলিম)। মুসলমানদের ওপর রামাদান মাসের পূর্ণ একমাস সিয়াম ফরজ হয় নবি (সা.) হিজরতের দ্বিতীয় সালে।

হিন্দুস্থানের ঐতিহ্য অনেক পুরোনো বলে মনে করা হয়। প্রত্যেক হিন্দুর প্রতিটি পূজায় ব্রতী পূজারি ও অনুষ্ঠানের উদ্যোক্তা নারী-পুরুষ উপবাস পালন করে থাকেন। তারা এক থেকে তিন দিন উপবাস ছাড়াও অমাবশ্যা ও পূর্ণিমা ইত্যাদি তিথিতে উপবাস করে থাকেন। চান্দ্র মাসের ১১ ও ১২ তারিখ ব্রাহ্মণরা একাদশী ও দ্বাদশীর উপবাস পালন করে থাকেন।

এ হিসাবে সারা বছর উপবাসের সংখ্যা দাঁড়ায় ২৪টি। কোনো কোনো ব্রাহ্মণ কার্তিক মাসের প্রতি সোমবার উপবাস পালন করেন। হিন্দুস্থানের প্রতিটি ধর্মে যেমন জৈন ধর্মের মধ্যে উপবাসের শর্তাবলী হলো কঠোর। তাদের হিসাবমতে ৪০ দিনে একটি উপবাসব্রত পালিত হয়।

গুজরাট ও দাক্ষিণাত্যের জৈন ধর্মাবলম্বীরা আজও প্রতি বৎসর কয়েক সপ্তাহ ধরে উপবাস পালন করেন। প্রাচীন মিশরীয়দের মাঝে এবং অন্যান্য ধর্মে আনন্দোৎসবের মতো উপবাস প্রথা চালু ছিল। গ্রিকদের মধ্যে বছরের একটি বিশেষ মাসে ক্রমাগত সাত দিন সাত রাত উপবাসের বিধান ছিল।

এ ধরনের দীর্ঘমেয়াদি উপবাস ছিল খুবই কষ্টকর এবং দুঃসহ। তাছাড়া পুরাকালে রোমান, কেল্ট, আসীরীয় ও বেবিলনীয়দের মাঝে উপবাসের বিধান চালু ছিল। জরথুস্থবাদী পারসিকরা নানাবিধভাবে উপবাস পালন করে থাকেন। কনফুসিয়াস বিভিন্ন রকমের উপবাসের প্রথা চালু করে।

বৌদ্ধরাও ‘চীবর’ অনুষ্ঠানের উপলক্ষ্যে উপবাস পালন করেন। পারসিকরা এগারো দিন উপবাস পালন করেন। কিন্তু অনেকে তেত্রিশ দিন আবার কেউ কেউ তিন দিন উপবাসব্রত পালন করে থাকেন। কোনো কোনো ধর্মে দিনে পানীয় ও ফল গ্রহণ করা উপবাস অবস্থায় বিধেয় মনে করেন।

এ রকম উপবাসব্রত পালনের মধ্যে নানা ধর্মে বিভিন্ন ধরনের হেরফের আছে। পারসিক ও ইহুদিদের কোনো কোনো উপবাসে পুরুষের পক্ষে নারীদের এবং নারীদের পক্ষে পুরুষদের সাক্ষাৎ মহাপাপ বলে মনে করা হয়। বৌদ্ধদের অনেক সময় উপবাস অবস্থায় নির্জনবাসে থাকতে হয় এবং দিনের শেষে একবার মাত্র এক মুষ্টি ভিক্ষার সামগ্রী সিদ্ধ করে খেতে হয়।

ইসলাম ধর্মে সিয়ামে এসব কোনো কিছুই নেই। সুবহে সাদেক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও ইন্দ্রিয়চর্চা নিষিদ্ধ এবং সার্বিকভাবে সবদিক থেকে সংযম সাধন করতে হয়।

আমাদের এ উপমহাদেশে ইসলামের আগমন এবং মুসলিম রাজত্ব প্রতিষ্ঠার পর ইসলাম ধর্মের অনুষ্ঠানগুলো পালন হতে থাকে। আরব ও অনারব মুসলমান ব্যবসায়ীরা বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে এ দেশে আসেন। ইরানিরা তখন শিক্ষা-দীক্ষায় উন্নত ছিল বিধায় ইসলামি কালচারে তাদের প্রভাব ছিল বেশি।

প্রকৃত পক্ষে তাদের মাধ্যমে ত্রয়োদশ ও চতুর্দশ শতকে এ দেশে রোজা ও ঈদ উদযাপন হতে থাকে। পরবর্তীকালে ইংরেজ শাসনের সময়কালে ইসলামি অনুষ্ঠানগুলো ততটা স্বাধীন ও উৎসাহব্যঞ্জক ছিল না। অপর দিকে ইসলামি কালচারে হিন্দু রীতিনীতির আধিপত্য বৃদ্ধি পেতে থাকে।

আবুল মনসুর আহমদ কর্তৃক রচিত ‘আত্মকথা’ গ্রন্থে তিনি লেখেন, ‘তরুণদেরতো কথাই নাই বয়স্কদের সকলে রোযা রাখিত না। যাহারা রোযা রাখিত তাহারাও দিনের বেলায় পানি ও তামাক খাইত। শুধু ভাত খাওয়া হইতে বিরত থাকিত। পানি ও তামাক খাওয়াতে রোযা নষ্ট হইত না এই বিশ্বাস তাহাদের ছিল। কারণ, পানি ও তামাক খাইবার সময় তাহারা রোযাটাকে একটা চোঙ্গার মধ্যে ভরিয়া রাখিত।

কায়দাটা ছিল এই, একদিকে গিরোওয়ালা মোটা বরাক বাঁশের দুই-একটা চোঙ্গা সব গৃহস্থের বাড়িতে থাকিত, আজো আছে। তাহাতে সারা বছর পুরুষরা তামাক রাখে, মেয়েরা রাখে লবণ, সজ, গরম মসলা, লাউ-কুমড়ার বীচি ইত্যাদি। রোযার মাসে মাঠে যাইবার সময় এই রকম এক একটা চোঙ্গা রোযাদাররা সঙ্গে রাখিত। পানি ও তামাকের সময় হইলে এই চোঙ্গার খোলা মুখে মুখ লাগাইয়া খুব জোরে দম ছাড়া হইত।

মুখ তোলার সঙ্গে সঙ্গে খুব তাড়াতাড়ি গামছা, নেকড়া বা পাটের ঢিপলা দিয়া চোঙ্গার মুখ কষিয়া বন্ধ করা হইত। যাহাতে বাতাস বাহির হইয়া না আসে। তারপর আবশ্যকমত পানি ও তামাক খাইয়া চোঙ্গা আবার মুখের কাছে ধরা হইত। খুব ক্ষিপ্ত হস্তে চোঙ্গার ঢিটলাটা খুলে মুখ লাগাইয়া বা মুখে চুষিয়া চোঙ্গার বন্ধ রোযা মুখে আনা হইত এবং ঢোক গিলিয়া একেবারে পেটের মধ্যে ফেলিয়া দেওয়া হইত। খুব ধার্মিক ভাল মানুষ এইরূপ করাটা পছন্দ করিতেন না বটে কিন্তু সাধারণভাবে এই প্রথাই চালু ছিল’।

তিনি আরও লেখেন ‘এরও আগে দিনে ও রাতে একটানা রোযা রাখা হইত। অনেকেই দুই তিনটির বেশী করিতে পারিতেন না। ফলে মাসে এক রোযা পেটপুরে ভাত আবার দুই তিনটি রোযা এক সাথে রাখা হইত। ছোটরা তো নয়ই, এমনকি বড়রা রোযা রাখিত না। কেবলমাত্র বয়বৃদ্ধরাই এইভাবে রোযা রাখিত। মাঝে যে কয়টি রোযা ভাঙ্গা হইত তাহা ঈদের পরে একটির বদলে দুইটি করিয়া আদায় করা হইত’।

লেখক: গবেষক ও ইসলামি চিন্তাবিদ

Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এ ক্যাটাগরীর আরো সংবাদ