আজ ৯ই শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ২৪শে জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

সাড়ে ৩ বছরের চেষ্টায় মৃত্যুর অনুমতি পেলেন তরুণী

(আজকের দিনকাল):ইউরোপের দেশ নেদারল্যান্ডসে স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণের অনুমতি পেয়েছেন জোরায়া টার বিক (২৯) নামে এক তরুণী। জোরায়া বিক নামের এই তরুণী ২০২০ সালের ডিসেম্বরে স্বেচ্ছায় মৃত্যুর আবেদন করেন। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে তার আবেদন মঞ্জুর হয়েছে। খবর দ্য গার্ডিয়ানের।

আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই নিজ বাড়িতে মৃত্যুবরণ করবেন তিনি। জোরায়া বিক মানসিক রোগে ভুগছেন। তার মধ্যে সবসময় বিষন্নতা, হতাশা, ভয় কাজ করে। এ কারণে ইচ্ছে করে তিনি দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে চলে যেতে চান।

নেদারল্যান্ডসে ২০০২ সাল থেকেই স্বেচ্ছায় মৃত্যুবরণের আইন রয়েছে। তবে স্বেচ্ছায় মৃত্যবরণে যারা আগ্রহ দেখান তাদের কঠোর প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। কীভাবে মৃত্যু হবে এবং কোন প্রক্রিয়ায় এটি সম্পন্ন করা হবে সেটি নিজেই জানিয়েছেন এই তরুণী। তিনি বলেছেন, “তারা প্রথমে ঘুমের ওষুধ দিয়ে শুরু করবে। যতক্ষণ পর্যন্ত আমি কোমাতে না যাচ্ছি ততক্ষণ পর্যন্ত আমাকে হার্টের কার্যকারিতা বন্ধের ওষুধ দেওয়া হবে না।

আমার জন্য বিষয়টি এমন হবে যেন আমি ঘুমিয়ে পড়েছি। আমার পার্টনার (প্রেমিক) আমার সঙ্গে সেখানে থাকবে। তবে তাকে আমি বলেছি আমার মৃত্যুর আগ মুহূর্তে সে চাইলে বাইরে বের হয়ে যেতে পারবে।” মৃত্যুর প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে এই তরুণীর বাড়িতেই চিকিৎসক আসবেন।

তিনি জানিয়েছেন, মৃত্যুর কথা চিন্তা করলে তার ভয় লাগে। অপরদিকে পরিবারের কথা চিন্তা করলে খারাপ লাগে। তবে তিনি সব জেনে বুঝেই এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যদিও চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তিনি চাইলে যে কোনো মুহূর্তে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারবেন।

টার বিক ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ানকে জানিয়েছেন, ‘লোকে মনে করে মানসিকভাবে অসুস্থ কেউ ঠিকমতো চিন্তা করতে পারে না। এই ভাবনা অপমানজনক। …কেউ কেউ মনে করেন, কিছু প্রতিবন্ধী ব্যক্তিকে স্বেচ্ছামৃত্যুর জন্য চাপে রাখা হয় কি না। কিন্তু নেদারল্যান্ডসে ২০ বছরের বেশি সময় ধরে এ আইন আছে। নিয়মকানুনগুলো ভীষণ কড়া, এবং সত্যিকার অর্থেই নিরাপদ।’

টার বিকের কষ্টের শুরুটা শৈশবেই। তিনি ক্রনিক ডিপ্রেশন (দীর্ঘস্থায়ী বিষণ্ণতা), উদ্বেগ, ট্রমা ও আনস্পেসিফাইড পারসোনালিটি ডিসঅর্ডারে ভুগছেন। তার অটিজমও রয়েছে।

প্রেমিকের সঙ্গে পরিচয় হওয়ার পর টার বিক ভেবেছিলেন তার সঙ্গে নিরাপদে থাকতে থাকতে একসময় তিনি সেরে উঠবেন। তবে নাকি ফল হয়নি। উল্টো তার ভেতরে আত্মহত্যাপ্রবণতা আরো বাড়তে থাকে।

৩০ সেশনেরও বেশি ইলেক্ট্রোকনভালসিভ থেরাপি (ইসিটি) নিয়েছেন তিনি। কিন্তু থেরাপিতে বিক টার নিজের সম্পর্কে, নিজের মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা সম্পর্কে অনেককিছু জানলেও তাতে ‘মূল সমস্যার সমাধান হয়নি’। তিনি বলেন, ‘চিকিৎসার শুরুতে মনে আশা জাগে। ভেবেছিলাম আমি ভালো হয়ে যাব। কিন্তু চিকিৎসায় যত সময় গড়াতে লাগল, আমি ততই আশা হারাতে শুরু করলাম।’

১০ বছর পরে চিকিৎসার আর ‘কিছুই বাকি নেই’। বিক টার বলেন, ‘আমি জানতাম, এখন যেভাবে বেঁচে আছি, তাতে টিকে থাকতে পারব না।’ বিক টার আত্মহত্যা করার কথা ভেবেছিলেন। কিন্তু স্কুলের এক বন্ধুর ভয়াবহ আত্মহত্যা এবং তার পরিবারের ওপর ওই ঘটনার প্রভাবের কথা মনে করে আত্মহনন থেকে বিরত থাকেন তিনি।

২০২০ সালে ইসিটি শেষ করার বেশ অনেকটা সময় পর, ওই বছরের ডিসেম্বরে স্বেচ্ছামৃত্যুর জন্য আবেদন করেন বিক টার। বিক টার জানান, আবেদন চূড়ান্ত হতে সাড়ে তিন বছর লেগেছে। তবে এই সময়েও তিনি একবারও নিজের সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেননি। তবে তার অপরাধবোধ হয়েছে নিজের সঙ্গী, পরিবার ও বন্ধুবান্ধবদের জন্য।

নিজের মেডিকেল টিমের সঙ্গে সাক্ষাতের পর টার বিক আশা করছেন, আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই তার জীবনাবসান করা হবে।

জীবনাবসানের দিনে মেডিক্যাল টিম টার বিকের বাড়িতে যাবে। তিনি জানান, ‘প্রথমে তারা আমাকে ঘুমের ওষুধ (সিডেটিভ) দেবেন। আমি কোমায় যাওয়ার পরই হৃৎস্পন্দন থামানোর ওষুধ দেবেন। আমার জন্য ব্যাপারটা হবে ঘুমিয়ে পড়ার মতো। আমার সঙ্গী উপস্থিত থাকবে, তবে ওকে বলেছি মৃত্যুর আগমুহূর্তে চাইলে ও ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে পারে।’

Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এ ক্যাটাগরীর আরো সংবাদ