• সোমবার, ০৪ মে ২০২৬, ০৫:১৬ অপরাহ্ন
Headline
নাটোরে ব্যবসায়ীকে গলা কেটে হত্যা, স্ত্রী-ছেলে আটক নারী এমপিরা সংসদকে প্রাণবন্ত করবেন: মির্জা ফখরুল মানানসই হয়নি পুলিশের নতুন পোশাক, শার্ট থাকবে আগের মতো প্যান্ট হবে খাকি: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ২০৮ প্রবাসী জুলাইযোদ্ধাকে ২৫ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দিতে রুল ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণে যে ৫ খাবার এড়িয়ে চলবেন বিসিবি ৬৫০ দিলেও কর্মীরা পান ৩০০ টাকা, দুর্নীতি দেখে ক্ষুব্ধ তামিম সাত দিনের প্রশিক্ষণে অংশ নেবেন ১০০ শিক্ষক, তালিকা প্রকাশ জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়ার সমাধিতে বিএনপির সংরক্ষিত নারী এমপিদের শ্রদ্ধা বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করতে প্রকল্প অনুমোদন সহজের নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর হাওরে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা প্রতি মাসে সাড়ে ৭ হাজার টাকা করে পাবেন: কৃষিমন্ত্রী

হাওড়ে রোদ উঠলেও কাটেনি হতাশা,খলায় চারা গজিয়ে পচছে ধান

Reporter Name / ০ Time View
Update : সোমবার, ৪ মে, ২০২৬

(আজকের দিনকাল): দুই মেয়েকে এ বছর বিয়ে দেওয়ার কথা ছিল সাজিদ মিয়ার। বোরো ধান উঠলে পাত্র দেখবেন-এই স্বপ্নেই ঋণ করে দেড় একর জমি করেছিলেন। নয় জনের সংসার। মাত্র এক সপ্তাহ পরেই ধান কাটা যেত। এখন জমির ওপর সাত থেকে আট ফুট পানি। নেত্রকোনার আনচাবিল হাওড়-পাড়ে বসে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিলেন তিনি। বললেন, ‘মেয়ের বিয়ের কথা এখন আর ভাবতেই পারছি না। ঘরে খাবার নেই। তার ওপর মাথায় ঋণের বোঝা।’

শুধু সাজিদ মিয়া নন। নেত্রকোনা থেকে সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ থেকে সিলেট-এবার পুরো হাওড়াঞ্চলজুড়ে একই চিত্র। রোববার হাওড়ের আকাশে কিছুটা রোদ উঠেছে। কিন্তু তাতেও কৃষকদের মাঝে হতাশা কাটেনি। তারা বলছেন, এই এক দিনের সামান্য রোদে কিছুই হবে না। টানা কয়েকদিন রোদ না থাকলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। ইতোমধ্যে হাওড়ের খলায় খলায় চারা গজিয়ে ধান পচে যাচ্ছে। নেত্রকোনায় ৬৯ হাজারেরও বেশি কৃষকের ৩১৩ কোটি টাকার ফসল পানির নিচে। সুনামগঞ্জে ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে জলাবদ্ধতা। দিরাইয়ের কৃষক প্রসাদ রায় শংকু বলেন, ‘এবার গরুর খাদ্যও নাই, মানুষের খাদ্যও নাই, ধান যেদিন কাটছিলাম রোদ না থাকায় তা গেরা উঠে পচন ধরছে।’

হাওড় গবেষক সঞ্জয় সরকার বলেন, হাওড় নিয়ে বিচ্ছিন্নভাবে পরিকল্পনা না করে টেকসই ও সুষ্ঠু পরিকল্পনা প্রয়োজন। এখন বৃষ্টি বা হাওড়ে পানি আসবে এটাই স্বাভাবিক। অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে বৃষ্টির পানি যেতে পারছে না। পানি যাওয়ার পথগুলো পলি জমে বন্ধ হয়ে গেছে। হাওড়ের অধিকাংশ জলকপাট (স্লুইসগেট) অকেজো হয়ে রয়েছে। তিনি বলেন, হাওড় এলাকায় ধান শুকানোর জন্য যন্ত্র স্থাপন করলে দুর্ভোগ কমবে।

এদিকে কিশোরগঞ্জে সরকারি ন্যায্যমূলে ধান ক্রয় শুরু হয়েছে। রোববার প্রথম দিনে ৯ টন ধান সংগ্রহ হয়েছে। ব্যুরো ও প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর-

নেত্রকোনা : কৃষক সাজিদ মিয়ার বাড়ি নেত্রকোনা সদর উপজেলার আমতলা ইউনিয়নের সাপমারা গ্রামে। তিনি জানান, সব ঠিক থাকলে দেড়শো মন ধান পেতেন। এখন এক মুঠো ধানও ঘরে তুলতে পারেননি। জমি আবাদ করতে শ্রমিক, সার-বীজ, কীটনাশক, সেচসহ আনুষঙ্গিক খরচ হয়েছে প্রায় এক লাখ টাকার মতো। নিজের কিছু সঞ্চয় ছিল, বাকিটা দার-দেনা করতে হয়েছে। এমনটা প্রতিবছরই করতে হয়। বৈশাখে নতুন ধান তুলে সেই ধান বিক্রি করে সব দেনা মিটিয়ে দেন। কিন্তু এবার তো হাত খালি। কী করবেন, কীভাবে চলবেন বুঝতে পারছেন না। তিনি আরও জানান, পরিবারে দুই ছেলে, চার মেয়ে ও মা আছেন। দুই মেয়েকে এ বছর বিয়ে দিতেন। নগদ টাকার চুক্তিতে কিছু জমি আবাদ করেন তিনি। চুক্তি অনুযায়ী এককালীন টাকা দিতে হয়। জমির ধান না পেলেও চুক্তির টাকা আর ফেরত পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। হাওড়ের এই ধানের ওপরই সব নির্ভর করে তার। সংসারের পুরো এক বছরের খাওয়ার পাশাপাশি সব খরচ জোগাতে হয় ধান বিক্রি থেকে। কিন্তু এবার অন্য খরচ মেটানো তো দূরের কথা, ঘরের মানুষের বছরের খাবারের ধানই মিলছে না।

একই গ্রামের ইদ্রিস মিয়ার এক একর ও সাবেক ইউপি সদস্য আব্দুর রবের ৭ একর জমির ধান ডুবে গেছে। শনিবার বিকালে কথা হয় তাদের সঙ্গে। আনচাবিলের পাড়ে পলিথিনের চটের ওপর ভেজা ধান শুকাতে দিয়েছেন তারা। রোদ না থাকায় শুকানো যায়নি। ইদ্রিস মিয়া বলেন, যা কিছু ধান কাটা হয়েছিল তাও বিক্রি করা যাচ্ছে না। দেড় হাজার টাকা রোজ শ্রমিক নিয়ে ধান কেটেছি। কিন্তু বাজারে ধান নেয় না কেউ! চারশ’ টাকা মন কয়!

খালিয়াজুরি উপজেলার কৃষ্ণপুর গ্রামের কৃষক জুয়েল মিয়া বলেন, বউ-বাচ্চা লইয়া পানিত নাইম্মা মাত্র কিছু ধান কাটছি। আর সব ধান পানির নিচে। কাটা ধানও শুকাইতে পারতাছি না।

জেলার হাওড়াঞ্চলসহ ১০ উপজেলায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। প্রশাসনের প্রাথমিক হিসাবে দেখা গেছে, ২২ হাজার ৩৪৮ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতি হয়েছে। এতে অন্তত ৬৯ হাজার ৬৯৮ জন কৃষকের ৩১৩ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে।

নেত্রকোনা জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হবে। মাঠপর্যায়ে প্রশাসনের কর্মকর্তারা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।

সুনামগঞ্জ : রোববার হাওড়ে রোদ উঠেছে। কৃষকরা ধান কাটা ও শুকানোতে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন। তবে জেলার ১২ উপজেলার হাওড়জুড়ে এখনও উদ্বেগ আর হতাশার চিত্র। কৃষকরা বলছেন, একদিনে রোদে কিছুই হবে না। টানা কয়েকদিন রোদ না থাকলে হওড়ের দুঃখ গুজবে না। জেলার জগন্নাথপুর উপজেলার নলুয়ার হাওড়পাড়ের কৃষক দিলদার হোসেন বলেন, বৃহস্পতি-শুক্রবার দুইদিন আবহাওয়া কিছুটা ভালো হওয়ায় ডুবে যাওয়া ধান কেটে কিছুটা শুকাতে পেরেছিলাম। কিন্তু শনিবারের বৃষ্টিতে আবার হতাশা বাড়িয়েছে। রোববার রোদ ওঠায় সারাদিন ভালো কেটেছে। টানা এক সপ্তাহ বৃষ্টি না থাকলে আমরা কাটা ধান কিছুটা বাড়িতে নিতে পারতাম।

কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, এবার সুনামগঞ্জের ১৩৭টি হাওড়ে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। শনিবার পর্যন্ত ৫৫ ভাগ ধান কাটা হয়েছে। প্রাথমিক হিসাবে, ১৮ হাজার হেক্টর জমিতে জলাবদ্ধতা রয়েছে।

দিরাই (সুনামগঞ্জ) : যেখানে সোনালি ধানের মৌ মৌ গন্ধে কৃষকের মুখে হাসি থাকার কথা, সেখানে ধানের পঁচা গন্ধে বিষাদের সুর। একটু রোদের আশায় দিরাইয়ের কৃষকরা। ধান শুকাতে না পারায় চারা গজিয়ে শত শত মন ধান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। রোববার সরেজমিনে দেখা যায়, রোদও নেই, বৃষ্টিও নেই, মেঘলা আকাশ। রোদের আশায় কৃষকরা আকাশের দিকে চেয়ে আছেন। মাঠে-ঘাটে-খলায় সর্বত্রই ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে ধান। কৃষি বিভাগ বলছে, রোদ না থাকায় মাড়াই করা অনেক ধান খলায় চারা গজিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে। উপজেলার প্রায় ৪০ হাজার কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বরাম হাওড়পাড়ের কৃষক বজলুর রশিদ বলেন, কিছু ধান কেটে সড়কে রাখছিলাম তাও শনিবার দিনভর মুষলধারে বৃষ্টিতে ডুবে গেছে। মাড়াই করা ধান রোদ না থাকায় গেরা উঠছে। খলায়, মাঠে, জমিতে সব ধান পচে যাচ্ছে।

ছাতক (সুনামগঞ্জ) : শ্রীনগর গ্রামের কৃষক আবুল কালাম বলেন, আমার ১৭ বিঘা জমিসহ আমাদের গ্রামের ২০০ বিঘার মতো ধান পুরোপুরি ডুবে গেছে। খেতের ধান আর উঠে আসবে না-এটা ভেবে বুক ফেটে যায়। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা তৌফিক হোসেন খান বলেন, আমরা কৃষকদের মাঠ পর্যায়ে পরামর্শ দিচ্ছি ধান ৮০ শতাংশ পাকা হলেই দ্রুত কেটে ফেলতে।

কিশোরগঞ্জ : ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম উপজেলার ক্ষতিগ্রস্ত বোরো চাষিদের কাছ থেকে সরাসরি সরকার নির্ধারিত ১৪৪০ টাকা মন দরে ধান ক্রয় অভিযান শুরু হয়েছে। রোববার এ তিন উপজেলায় এর উদ্বোধন করেন সংশ্লিষ্ট উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তারা। প্রথম দিনে ৩ টন করে মোট ৯ টন ধান সংগ্রহ করা হয়েছে। এতে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে বোরো চাষিদের মধ্যে।

বিয়ানীবাজার (সিলেট) : উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাজেদুর রহমান জানান, রোববার দুপুর পর্যন্ত প্রায় ১৪ হেক্টর জমির বোরো আবাদ তলিয়ে গেছে। আরও বেশ কিছু জমি তলিয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। কৃষক কবির মিয়া বলেন, বজ্রপাতের আতঙ্কে শ্রমিকরা হাওড়ে ধান কাটছে না।-ডেস্ক


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা