মো: ইদ্রিস আলী, ( আজকের দিনকাল):বাংলাদেশের কিছু জঙ্গি গোষ্ঠী মানুষকে এটা বলে বুঝাতে চাই মুসলমানরা প্রায় ৮০০ বছর ভারতবর্ষ শাসন করেছে।
একটু গভীরভাবে তলিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, সেই দীর্ঘ শাসনামলে ধর্মকে অর্থনীতি বা রাজনীতির সাথে গুলিয়ে ফেলা হয়নি।
বিশেষ করে বাদশা আকবরের কথা উল্লেখ করা যায়। তিনি সকল ধর্মের মানুষকে এক সুতোয় বাঁধার জন্য ‘দীন-ই-ইলাহী’র মতো উদার প্রচেষ্টা চালিয়েছিলেন। দেখা যায়, যারা বাইরে থেকে এসে ভারতবর্ষ শাসন করেছে, তারা কেউ চরমপন্থী হিন্দু বা কট্টর মুসলমান হিসেবে নয়, বরং এ দেশের সংস্কৃতির সাথে মিশে গিয়ে “ভারতীয়” হয়েই রাজত্ব করেছে।
একমাত্র বৃটিশ বনিকেরা বাহিরে থেকে এসে ভারত বর্ষকে লুট করে নিয়ে গেছে। করতে পেরেছিল কারণ বৃটিশরা ভারতীয়দের হিন্দু মুসলমানে ভাগ করতে পেরেছিল বলে।
স্মৃতির জানালা:
১৯৪৭ সালের দেশভাগের পেছনে অনেক কারণ থাকতে পারে তবে মুল কারণ ছিলো অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, ভৌগোলিক অনেক কারণই থাকতে পারে, কিন্তু শুরুর দিকে তা সাধারণ মানুষের মনস্তত্ত্বে কোনো দেয়াল তুলতে পারেনি। দেশভাগের পর দীর্ঘ সময় পর্যন্ত ভারত ও পূর্ব পাকিস্তান সীমান্তে কোনো কাঁটাতারের বেড়া দেওয়ার প্রয়োজন পড়েনি। এপার থেকে ওপার, ওপার থেকে এপারে যাতায়াতের ক্ষেত্রে কোনো অদৃশ্য বা দৃশ্যমান কোন বাধা ছিল না।
আমি নিজে দেখেছি, প্রতিদিন সকালে হাজার হাজার শ্রমজীবী মানুষ দল বেঁধে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে যেতেন কাজ করতে। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে সন্ধ্যায় মজুরি নিয়ে তা দিয়ে বাজার সদায় করে আবার আপন নীড়ে ফিরে আসতেন। মানচিত্রে দেশ ভাগ হলেও মানুষের মনকে যে ভাগ করা যায়নি, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ ছিল তখনকার অটুট সামাজিক ও মানবিক সম্পর্ক।
এই প্রসঙ্গে আমার জীবনের একটি সত্য ঘটনা উল্লেখ করা যায়। ভারত সীমান্ত লাগোয়া যমুনা নদীর ধারে ‘মাধবপাড়া’ গ্রাম, হিলি থেকে উত্তর পশ্চিম দিকে । সেখানে আমার বড় দাদু (দাদুর বড় ভাই) স্থায়ীভাবে বসবাস করতেন। সেই সুবাদে ওই গ্রামে আমার প্রায়ই যাওয়া-আসা ছিলো। আমার এক চাচা সেখানে মুদি দোকান চালাতেন। দোকানের মালামাল দরকার পড়লে কাছাকাছি বাজার ছিলো ওপারের বালুঘাট বাজার।তাই সস্তায় মালামাল কেনার জন্য তাকে যেতে হতো ভারতের বালুঘাটে। আমি দেখতাম, খুব ভোরে উঠে চাচা গরুর গাড়ি নিয়ে অনায়াসে বর্ডার পেরিয়ে বালুঘাটে চলে যেতেন। সারাদিন কেনাকাটা শেষে সন্ধ্যায় আবার নির্বিঘ্নে ফিরে আসতেন। তখনও সীমান্তে ভারতের বিএসএফ ছিল, এপারে ইপিআর ছিল—কিন্তু তাদের মধ্যে কোনো বৈরিতা ছিল না, মানুষের যাতায়াতে কোনো বাধা ছিল না। আজ যখন সীমান্তে কাঁটাতারের নিষ্ঠুর বেড়া দেখি, প্রতিদিন বিএসএফের গুলিতে সাধারণ মানুষের মৃত্যুর খবর শুনি, তখন বুকটা কেঁপে ওঠে। মনে প্রশ্ন জাগে—তখন যা সম্ভব ছিল, এখন কেন তা হিংস্রতায় রূপ নিল? আমরা কি কখনো এর পেছনের গভীর কারণগুলো ভেবে দেখেছি? আমরা যখন ভারতের বিরোধিতা করি তখন বাস্তবতার নিরিখে পিছনের কারণ গুলো পরখ করে দেখেছি কি??
দেশভাগের নেপথ্য কারণ, ব্যবসায়িক স্বার্থ ও ধর্মের রাজনীতিঃ
দেশভাগের পেছনে অনেক ঐতিহাসিক কারণের কথা বলা হয়, তবে এর অন্যতম একটি বড় কারণ ছিল অর্থনৈতিক ও ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা। আদিকাল থেকেই এই অঞ্চলে ব্যবসা-বাণিজ্যে মাড়োয়ারি সম্প্রদায়ের একচেটিয়া আধিপত্য ছিল। পরবর্তীতে বাঙালি মুসলমানেরাও ব্যবসা শুরু করে। কিন্তু অভিজ্ঞ ও পুঁজিতে শক্তিশালী মাড়োয়ারি ব্যবসায়ীদের সাথে প্রতিযোগিতায় তারা পেরে উঠছিল না। ফলে, তৎকালীন এক শ্রেণির উদীয়মান ও স্বার্থান্বেষী ব্যবসায়ীদের নিজস্ব সুবিধার্থেই দেশ ভাগ করার একটি প্রচ্ছন্ন প্রয়োজন তৈরি হয়েছিল।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, দেশভাগের প্রথম দিকেও সেই উদ্দেশ্য পুরোপুরি সফল হয়নি। মানুষের যাতায়াত এবং সীমান্তকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য আগের মতোই স্বাভাবিক গতিতে চলতে থাকে এবং সাধারণ মানুষের ভারতের উপর নির্বভরতা আগের মতো থেকে যায়। এতে এক শ্রেণির স্থানীয় ব্যবসায়ী গোষ্ঠী ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। তখন তারা বুঝতে পারল, কেবল ভূখণ্ড ভাগ করে লাভ নেই; মানুষের মনস্তত্ত্বে হিংসা ও বিভেদের বীজ বপন করতে হবে, মানুষ কে ভারত বিদ্বেশী করে তুলতে হবে। এই লক্ষ্যেই তারা রাজনীতিকে আগেই ঢাল বানিয়েছিল, এবার তারা সরাসরি ‘ধর্মীয় আবেগ’কে সামনে নিয়ে আসলো।
দেশভাগের কুপ্রভাব: আন্তর্জাতিক চক্রান্ত ও জঙ্গিবাদের উত্থান
ব্রিটিশরা বুঝে ফেলেছিল যে, ভারতীয়রা ধর্মের ব্যাপারে অত্যন্ত সংবেদনশীল ও দুর্বল। এই ধর্মীয় দুর্বলতাকে পুঁজি করেই তারা দীর্ঘ ১৯০ বছর ভারতবর্ষ শাসন করেছে। নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে তারা ধর্মের কার্ড খেলেছে, লোভ দেখিয়ে এক ভারতীয়কে লেলিয়ে দিয়েছে অন্য ভারতীয়ের বিরুদ্ধে। যার চূড়ান্ত ও নির্মম পরিণতি ছিল ‘বঙ্গভঙ্গ’ এবং পরবর্তীতে ভারতভাগ। এর আগে কিন্তু সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন স্থায়ী বিভেদ ছিল না। ব্রিটিশরা এই বিভাজনের রাজনীতি খুব নিখুঁতভাবে করেছিল। এমনকি তাদের পরোক্ষ সহায়তায় ও ব্রিটিশ রাজত্ব টিকিয়ে রাখার স্বার্থে ১৯০৬ সালে ‘মুসলিম লীগ’ ১৯২৫ সালে এর এস এস এবং পরবর্তীতে ১৯৪১ সালে আরও কট্টরপন্থী দল ‘জামায়াতে হিন্দ’ (পরবর্তীতে জামায়াতে ইসলামী)-এর মতো ধর্ম ভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর জন্ম হয়েছিল। সকালে ব্রিটিশ শাসকদের বিরুদ্ধে আন্দোলন করছে এক মাত্র জামায়াতে ইসলামী ছাড়া।
৪৭ এদের দেশ ভাগের পরেও ধর্মকে পুঁজি করে সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করার এই নোংরা খেলা চলতেই থাকলো যার ফল হলো অত্যন্ত ভয়াবহ। হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, সহিংসতা ও জড়াও-পোড়াওয়ের রাজনীতি শুরু হলো। এই অভ্যন্তরীণ বিভেদের সুযোগ লুফে নিল আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতির খেলোয়াড়রা। পাকিস্তানের ‘আইএসআই’ (ISI) এবং আমেরিকার ‘সিআইএ’ (CIA)-র মতো আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা গোষ্ঠীগুলো এই অঞ্চলে নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্য সক্রিয় হয়ে উঠল।
তারা এ দেশে উগ্রবাদ ও জঙ্গিবাদ তৈরিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তা দিতে শুরু করে। একপর্যায়ে এই জঙ্গি তৎপরতা কেবল দেশের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকল না, তা ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে দাঁড়াল। আর ঠিক এরই ফলস্বরূপ, ভারত নিজেদের দেশের অখণ্ডতা এবং জনগণের জানমালের সুরক্ষার অজুহাতে সীমান্তে আজকের এই মজবুত কাঁটাতারের বেড়া দিতে বাধ্য হয়। যে সীমান্ত একসময় ছিল সম্প্রীতির মিলনমেলা, আজ তা কাঁটাতার আর বুলেটের চাদরে ঢাকা।
ভারত-বিরোধিতা বনাম অন্ধ রাজনীতিঃ
বর্তমান বাংলাদেশের রাজনীতির একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে অন্ধ ‘ভারত-বিরোধিতা’। সস্তা রাজনৈতিক সুবিধা বা ভোট পাওয়ার জন্য ভারতকে প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করানোটা এখানে এক নিয়মে পরিণত হয়েছে। অথচ বাস্তবতার নিরিখে চিন্তা করলে দেখা যাবে, ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক কারণে একে অপরকে ছাড়া চলা অসম্ভব।
আমাদের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য থেকে শুরু করে চিকিৎসাসেবা, বাণিজ্য—অনেক ক্ষেত্রেই ভারতের ওপর নির্ভরশীলতা একটি বাস্তব সত্য। এই আঞ্চলিক ও অর্থনৈতিক কূটনীতির সহজ সমীকরণটি আমাদের দেশের এক শ্রেণির মানুষ কবে বুঝবে? নাকি সস্তা আবেগে ভেসে এই অন্ধ রাজনীতির বৃত্তেই আটকে থাকবে? যার ফলাফল ভোগ করবে দেশের সাধারণ জনগণ।
শ্রমিক ফেডারেশন নেতা
মো: ইদ্রিস আলী