(আজকের দিনকাল):কুষ্টিয়ার মিরপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ‘দলিল লেখক সমিতি’র এক অভিনব ও বিশাল অঙ্কের অর্থ লুটপাটের চক্রান্ত ফাঁস হয়েছে। সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের জিম্মি করে এবং নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট প্রতি মাসে প্রায় ২ কোটি টাকা অবৈধ চাঁদা আদায়ের এক মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, মিরপুর দলিল লেখক সমিতির কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার প্রত্যক্ষ ইন্ধনে এই সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যার মূল লক্ষ্য—জনগণের পকেট কেটে নিজেদের পকেট ভারী করা।
দলিল প্রতি ১০ হাজার টাকা চাঁদার ছক!
জমি কেনাবেচা, দলিল লিখন এবং রেজিস্ট্রেশনের প্রতিটি ধাপে সাধারণ মানুষকে বাধ্য করে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের একটি সুনির্দিষ্ট ‘খাত’ বা চার্ট তৈরি করেছে এই চক্র।
মূল পরিকল্পনা: সরকারি নির্ধারিত ফি-র বাইরে প্রতিটি দলিলের জন্য ১০ হাজার টাকা করে সিন্ডিকেটের ফান্ডে জমা দিতে হবে।বর্তমান চিত্র: ইতিমধ্যেই দলিল প্রতি ২০০ টাকা করে জোরপূর্বক আদায় শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমেই দিনে প্রায় ২০ হাজার টাকা অবৈধভাবে সমিতির ফান্ডে জমা হচ্ছে।
হুমকি ও হয়রানি: সিন্ডিকেটের এই অলিখিত নিয়ম না মানলে সাধারণ দলিল লেখকদের কাজ করতে বাধা দেওয়া এবং সেবাগ্রহীতাদের নানা অজুহাতে হয়রানি করার নীলনকশা তৈরি করা হয়েছে।
মিরপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে প্রতি মাসে সম্পাদিত দলিলের গড় হিসাব কষে এই সিন্ডিকেট ন্যূনতম ২ কোটি টাকা তোলার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে বলে জানা গেছে।
আগের সমিতির ৩৫ লাখ টাকা গায়েব!
এই চক্রান্তের খবর জানাজানি হতেই মিরপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস এলাকায় তীব্র উত্তেজনা ও সাধারণ দলিল লেখকদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন সাধারণ দলিল লেখক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন:”কিছু অর্থলোভী দলিল লেখকের কারণে মিরপুরে পুরো দলিল লেখক সমাজের বদনাম হচ্ছে। বিগত সময়ের মতো এই সিন্ডিকেট চালু হলে সাধারণ মানুষ জমি রেজিস্ট্রি করতে এসে আবারও চরম ভোগান্তিতে পড়বেন, আর দোষ হবে আমাদের সাধারণ লেখকদের। আমরা এই চাঁদাবাজির পরিকল্পনা ধূলিসাৎ করার জোর দাবি জানাচ্ছি।”
তারা আরও বিস্ফোরক অভিযোগ এনে বলেন, বিগত ৫ই আগস্টের প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পূর্বে গঠিত সমিতিতে প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লক্ষ টাকা জমা ছিল। কিন্তু ক্ষমতার পালাবদলের সাথে সাথেই উক্ত তহবিলের পুরো টাকা গায়েব হয়ে যায়, যার আজ পর্যন্ত কোনো হদিস মেলেনি।
ফুঁসে উঠছেন ভুক্তভোগীরা: প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি
ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ বলছেন, ডিজিটাল বাংলাদেশে যখন সব সেবা সহজ ও স্বচ্ছ করার কথা, তখন এই ধরনের ‘অ্যানালগ সিন্ডিকেট’ ও প্রকাশ্য চাঁদাবাজির চক্রান্ত কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। প্রয়োজনে তারা সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে মানববন্ধনসহ কঠোর কর্মসূচি পালনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, আইন-কানুনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তৈরি করা এই ‘চাঁদা আদায়ের মহোৎসব’ রুখতে এখনই দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং স্থানীয় প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। চক্রের মূল হোতাদের দ্রুত আইনের আওতায় না আনলে মিরপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের পুরো চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অভিযুক্ত সভাপতির অসংলগ্ন বক্তব্য
এ বিষয়ে জানতে চাইলে মিরপুর দলিল লেখক সমিতির সভাপতি হাবি মোহরী উল্টো সাফাই গেয়ে বলেন:”কিছু কিছু দলিল লেখক আছে যারা অল্প টাকাতে দলিল সম্পাদন করে পরিবেশ নষ্ট করছে। পরিবেশ যাতে নষ্ট না হয় সে ব্যপারটা মাথায় রেখে বেশ কিছু দলিল লেখকদের নিয়ে আমরা একটি সমিতি করেছি। সমিতির কল্যাণে ২শ’ টাকা করে আপাতত আদায় করা হচ্ছে।”
তবে দলিল প্রতি ১০ হাজার টাকা করে আদায়ের মহাপরিকল্পনার কথা জানতে চাইলে তিনি প্রথমে দাবি করেন, “বিগত সময় থেকে এটা হয়ে আসছে, ৫ই আগস্টের পর থেকে বন্ধ রয়েছে।” কিন্তু “তাহলে এখন কেন পুনরায় ১০ হাজার টাকা আদায়ের চক্রান্ত করা হচ্ছে?”—এমন সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের মুখে তিনি আর কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।