(আজকের দিনকাল):বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) আর্থিক বিতর্কের রেশ না কাটতেই এবার ধানমন্ডি মহিলা ক্রীড়া সংস্থার নামে সংরক্ষিত ২০ কোটি টাকার দুটি এফডিআর (স্থায়ী আমানত) ঘিরে চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। এ ঘটনায় ক্রীড়াঙ্গনে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র আলোড়ন। সংস্থার আর্থিক নিরাপত্তা, ব্যাংকিং স্বচ্ছতা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি নিয়ে দেখা দিয়েছে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা। বাফুফের টাকা উধাও হয়েছিল তাদেরই তহবিল থেকে। আর মহিলা ক্রীড়া সংস্থার টাকা গায়েব হয়েছে সোনালী ব্যাংক থেকে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, সোনালী ব্যাংকের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় করপোরেট শাখায় ধানমন্ডি মহিলা ক্রীড়া সংস্থার নামে সংরক্ষিত দুটি এফডিআরের নম্বর ০১০৭৩০৫০০০৭৬৩ এবং ০১০৭৩০৫০০১০৩৩। প্রথমটি ২০২২ সালের ২১ এপ্রিল ১০ কোটি টাকা এবং দ্বিতীয়টি ২০২৪ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি আরও ১০ কোটি টাকা হিসাবে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর থেকে মহিলা ক্রীড়া সংস্থাকে অনুদান দেওয়ার চিঠির মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়।
শর্ত ছিল, এই ২০ কোটি টাকার স্থায়ী আমানত থেকে অর্জিত মাসিক লভ্যাংশের ৮০ শতাংশ ধানমন্ডি মহিলা ক্রীড়া সংস্থার উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে ব্যয় করা যাবে এবং অবশিষ্ট ২০ শতাংশ মূলধনের সঙ্গে যুক্ত হবে। লভ্যাংশের অর্থ সোনালী ব্যাংকের ধানমন্ডি করপোরেট শাখায় বাংলাদেশ মহিলা ক্রীড়া সংস্থার হিসাব নম্বর ৪৪১৫০০২০৩৭৭৩৭-এ নিয়মিত জমা হতো। দীর্ঘদিন নিয়ম মেনে লভ্যাংশ জমা হলেও হঠাৎ করেই চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে বন্ধ হয়ে যায় হিসাব বিবরণী প্রদান। সর্বশেষ গত সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিবরণী পাঠানো হলেও এরপর আর কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। এফডিআরের হালনাগাদ বিবরণী সংগ্রহের জন্য মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক ফিরোজা করিম নেলী ৫ মে সোনালী ব্যাংকের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় করপোরেট শাখায় চিঠি দেন। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, ব্যাংক কর্মকর্তারা নানা টালবাহানা শুরু করেন।
ফিরোজা করিম নেলী বলেন, ‘তারা একেক সময় একেক কথা বলেন। পরে কোষাধ্যক্ষের স্বাক্ষরসহ চিঠি নিয়ে যেতে বলেন। বৃহস্পতিবার সকালে আমরা ব্যাংকে গেলে এক অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার আলী নুর আমাদের সঙ্গে চরম দুর্ব্যবহার করেন। তিনি বলেন, এই টাকা তো মহিলা ক্রীড়া সংস্থার নয়। যাদের টাকা, তাদের ফেরত দেওয়া হয়েছে।’ নেলী আরও বলেন, ‘এফডিআর সংস্থার নামে, অনুদানের টাকা। সংস্থাকে না জানিয়ে এই টাকা সরানো যায় কিনা, এ প্রশ্ন করতেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা রুদ্রমূর্তি ধারণ করেন। একপর্যায়ে ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার শামীমা নুর জানান, সাবেক প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের চিঠির প্রেক্ষিতে জানুয়ারিতে দুটি এফডিআরের সম্পূর্ণ অর্থ মূল হিসাবে ফেরত পাঠানো হয়েছে। তখন আমি বলি, টাকা কোথা থেকে এসেছে সেটা বিবেচ্য নয়। এফডিআর সংস্থার নামে। আমাদের না জানিয়ে এটা কীভাবে সম্ভব? লিখিতভাবে স্ট্যাটাস জানাতে বললেও তারা রাজি হননি।’
ধানমন্ডি মহিলা ক্রীড়া সংস্থাকে আনুষ্ঠানিকভাবে না জানিয়ে কীভাবে তাদের নামে সংরক্ষিত ২০ কোটি টাকার স্থায়ী আমানত স্থানান্তর করা সম্ভব হলো, এমন প্রশ্নে সোনালী ব্যাংকের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার শামীমা নুর বলেন, ‘আমরা সংস্থার কর্মকর্তাদের বিষয়টি বুঝিয়ে বলেছি।’ তবে লিখিত ব্যাখ্যা কেন দেওয়া হয়নি, এ প্রশ্নে তিনি স্পষ্ট উত্তর দিতে পারেননি।
ফিরোজা করিম নেলীর ভাষায়, ‘ব্যাংক কর্মকর্তাদের ব্যাখ্যার অস্পষ্টতা ঘটনাটিকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। আমার আশঙ্কা, এটি শুধু প্রশাসনিক ত্রুটি নয়; বরং ক্রীড়া প্রতিষ্ঠানের আর্থিক নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর অনিয়মের ইঙ্গিতও হতে পারে। বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, আর্থিক নথিপত্র প্রকাশ এবং দায় নির্ধারণ জরুরি।’ তিনি জানান, পুরো বিষয়টি ইতোমধ্যে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদকে অবহিত করা হয়েছে। আগামী রোববার যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়কেও বিস্তারিত জানিয়ে আনুষ্ঠানিক চিঠি দেওয়া হবে। প্রশ্ন হলো, ধানমন্ডি মহিলা ক্রীড়া সংস্থার দুটি এফডিআরের আড়ালে লুকিয়ে থাকা প্রকৃত সত্য কি প্রকাশ পাবে, নাকি ২০ কোটি টাকার এই আর্থিক রহস্য আরও গভীর অন্ধকারে হারিয়ে যাবে?-যুগান্তর