(আজকের দিনকাল):কিশোরগঞ্জের হাওর জুড়ে এখন কেবলই হাহাকার। ফসল হারানোর শোকে ঘরে ঘরে কান্না। টানা বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলে সর্বস্বান্ত লাখো কৃষক। প্রত্যন্ত হাওরের তিন উপজেলা ইটনা, অষ্টগ্রাম ও মিঠামইনের বেশির ভাগ ফসলের মাঠই এখন পানির নিচে। কৃষকের ঘাম ঝরানো ফসলের মাঠে বিস্তীর্ণ জলরাশি। কোথাও বুক পরিমাণ আবার কোথাও বা তার চেয়ে বেশি। হাওর জুড়ে থাকা সবুজ ফসলের মাঠ সপ্তাহের ব্যবধানে উধাও হয়ে গেছে। এরপরও নদী উপচে এবং ফসল রক্ষা বাঁধের পাড় ডুবে তলিয়ে যাচ্ছে একের পর এক হাওর। প্রতিদিনই বাড়ছে তলিয়ে যাওয়া হাওরের সংখ্যা। বৃহস্পতিবারও ইটনা ও মিঠামইন এই দুই উপজেলার অন্তত আড়াই হাজার হেক্টর জমি নতুন করে তলিয়ে গেছে।
বৃহস্পতিবার সকালে হাওরের ক্ষতিগ্রস্ত বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেছেন জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করে তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন জানান- এ বছর হাওরে ১ লাখ ৪ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ করা হয়েছিল। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত ৫১ শতাংশ ফসল কাটা সম্ভব হয়েছে। টানা কয়েকদিনের বৃষ্টিতে অবশিষ্ট ফসলের একটি বড় অংশ পানির নিচে তলিয়ে গেছে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে রোদের দেখা দেয়ায় জেলা প্রশাসক বলেন- আবহাওয়া এখন কিছুটা অনুকূলে থাকায় কৃষকর শ্রমিক ও হারভেস্টার মেশিন ব্যবহার করে দ্রুত ফসল কাটার চেষ্টা করছেন।
সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন- স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও নেতৃবৃন্দ স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে কৃষকদের সহায়তা করছেন, যাতে দ্রুত এই সংকট মোকাবিলা করা যায়। এ ছাড়া যেসব কৃষক এখনো ফসল ঘরে তুলতে পারেননি, তাদের জন্য সরকার বিশেষ সহায়তা পরিকল্পনা গ্রহণ করছে, যাতে আগামী তিন মাস তারা কোনো কষ্টে না থাকেন। অন্যদিকে জেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত জেলায় ফসলহানির পরিমাণ ছিল সাড়ে ৪ হাজার হেক্টর জমি। বৃহস্পতিবার তা গিয়ে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৭৬৮ হেক্টরে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ইটনা উপজেলায় সর্বোচ্চ ২৬৫০ হেক্টর, অষ্টগ্রামে ১৮৫৪ হেক্টর, নিকলীতে ৭৭৯ হেক্টর এবং মিঠামইনে ৫৫০ হেক্টর জমি তলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
তবে স্থানীয় কৃষকরা কৃষি বিভাগের এই হিসাব মানছেন না। তারা বলছেন, ক্ষতির পরিমাণ আরও অনেক বেশি। ইটনা, অষ্টগ্রাম ও মিঠামইন এই তিনটি উপজেলায় আবাদি জমির বেশির ভাগই এখন জলমগ্ন। সে হিসাবে অন্তত এখন ২০ হাজার হেক্টরের ফসলহানি হয়েছে। এ ছাড়া তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে এখন পর্যন্ত অক্ষত হাওরগুলোও। তবে বৃহস্পতিবার বৃষ্টি না হওয়ায় এবং আকাশে ঝলমলে রোদ ওঠায় কৃষকরা কিছুটা স্বস্তিতে রয়েছেন। ইটনা উপজেলার কাকটেংগুর গ্রামের কৃষক ফেরদৌস মিয়া জানান- সারা বছরের খোরাকের জন্য এক একর জমি করেছিলেন বাড়ির পেছনে। বৃষ্টির পানি আর উজানের ঢলে তার সেই জমিটাই ডুবে গেছে। একই উপজেলার মুদিরগাঁও গ্রামের সোহেল তানভীর বলেন, এখন হাওরে এমন অবস্থা ধান কাটলেও সমস্যা আবার ধান না কাটলেও সমস্যা। কাটা ধান খলায় পড়ে থেকে চারা গজাচ্ছে। মিঠামইন উপজেলার ঢাকী ইউনিয়নের শান্তিপুর গ্রামের কৃষক আলী হোসেন জানান- জোড়বিলা হাওরে তিনি ৭ একর জমিতে আবাদ করেছিলেন। ইতিমধ্যে তিন একর জমি কেটেছেন। বাকি চার একর জমিতে পানি উঠে গেছে। শ্রমিক, হারভেস্টার মেশিন না পেয়ে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে ধান কাটতে নেমেছেন তিনি।-ডেস্ক
Leave a Reply