আজ ১৮ই বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ, ১লা মে, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র,বদলে গেছে এলাকার জীবন-অর্থনীতি

(আজকের দিনকাল):দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও নানা জল্পনা-কল্পনার অবসান ঘটিয়ে দেশের ইতিহাসে নতুন এক মাইলফলক স্পর্শ করলো পাবনার ঈশ্বরদীতে অবস্থিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়েছে জ্বালানি (ফুয়েল) লোডিং কার্যক্রম, যার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ প্রবেশ করলো পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের যুগে। দেশের বৃহত্তম এ মেগা প্রকল্পকে ঘিরে গত এক দশকে ঈশ্বরদীর আর্থ-সামাজিক অবস্থায় এসেছে আমূল পরিবর্তন। একসময় অবকাঠামোগতভাবে পিছিয়ে থাকা এ অঞ্চল এখন গড়ে উঠেছে আধুনিক নগরায়ণের এক উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে। উন্নত সড়কব্যবস্থা, আধুনিক আবাসন, আন্তর্জাতিক মানের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান-সব মিলিয়ে পাল্টে গেছে পুরো এলাকার চিত্র। প্রকল্পের শুরু থেকেই বিদেশি বিশেষজ্ঞদের, বিশেষ করে রুশ নাগরিকদের বসবাসের জন্য নির্মিত হয়েছে আধুনিক আবাসন এলাকা, যা স্থানীয়ভাবে ‘রাশিয়ান পল্লী নামে পরিচিত।

এ এলাকাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে রেস্তোরাঁ, শপিংমল ও বিভিন্ন বিনোদনকেন্দ্র। স্থানীয়দের ভাষায়, ঈশ্বরদী এখন যেন এক টুকরো রাশিয়া। এখানে কর্মরত রুশ বিশেষজ্ঞরাও বাংলাদেশের মানুষ ও সংস্কৃতির প্রশংসা করেছেন। রুশ প্রকৌশলী অ্যালোনাস্কভক্স বলেন-বাংলাদেশের মানুষ অত্যন্ত আন্তরিক ও অতিথিপরায়ণ। এখানে কাজ করতে আমরা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছি। স্থানীয়দের সহযোগিতা আমাদের কাজকে সহজ করেছে। স্থানীয় বাসিন্দারাও এই পরিবর্তনে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। রূপপুরের বাসিন্দা ও ব্যবসায়ী রায়হান উদ্দিন জানান, আগে এখানে কাজের সুযোগ খুব কম ছিল। এখন রূপপুর প্রকল্পের কারণে অনেকেই চাকরি পাচ্ছেন। আমাদের জীবনযাত্রার মান অনেক উন্নত হয়েছে। ব্যবসায় বেড়েছে গতি। রূপপুর প্রকল্পের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে স্থানীয় জীবনমান ও অর্থনীতিতে। প্রকল্প এলাকাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে আধুনিক আবাসন, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক মানের বাণিজ্যিক অবকাঠামো। বিশেষ করে গ্রিনসিটি এলাকা এখন আধুনিক নগরায়ণের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও এসেছে বড় পরিবর্তন।

আগে যেখানে কাজের সুযোগ সীমিত ছিল, এখন সেখানে হাজার হাজার মানুষ বিভিন্ন খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন। স্থানীয় তরুণ-তরুণীরা কাজ করছেন হোটেল, রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে। বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে অনেকেই রুশ ভাষা শিখে নতুন দক্ষতা অর্জন করেছেন। শিক্ষাক্ষেত্রেও তৈরি হয়েছে নতুন সম্ভাবনা। এদিকে, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ঘিরে বাড়ছে দর্শনার্থীদের আগ্রহও। প্রতিদিন অন্তত এক থেকে দেড় হাজার মানুষ দেশের এই পারমাণবিক প্রকল্পটি এবং এলাকা একনজর দেখতে রূপপুর আসেন। তবে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা (কেপিআই) জোন হওয়ায় তারা ভেতরে প্রবেশ করতে পারেন না। ফলে অনেকেই দূর থেকে বা লালন শাহ্‌ সেতু থেকে প্রকল্পটি দেখেন, ছবি তোলেন এবং ভিডিও ধারণ করে সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করেন। দর্শনার্থীদের অনেকে এখানে একটি পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন।

তাদের মতে, প্রকল্প এলাকায় পরিকল্পিতভাবে দর্শনার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট ভিউ পয়েন্ট, পার্ক বা পর্যটন সুবিধা গড়ে তোলা হলে একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের আগ্রহ পূরণ হবে, অন্যদিকে সরকারের রাজস্ব আয়ও বাড়বে। পাকশী এলাকা নিজেই একটি ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত জনপদ। বৃটিশ আমল থেকে এখানে রেলওয়ের আঞ্চলিক সদরদপ্তর ছিল। পাশাপাশি পদ্মা নদীর ওপর ১১১ বছরের প্রাচীন হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ও ২৪ বছরের লালন শাহ্‌ সেতু এই অঞ্চলের ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। দুই থেকে তিনশ’ বছরের পুরনো বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষ এ এলাকাকে দিয়েছে ভিন্নমাত্রা। এত সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও এখানে পর্যাপ্ত আবাসন সুবিধা না থাকায় দর্শনার্থীরা বেশিক্ষণ অবস্থান করতে পারেন না। সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে উল্লেখযোগ্য কোনো হোটেল-মোটেল গড়ে না ওঠায় অনেকে দিন শেষে ফিরে যেতে বাধ্য হন।

এতে একদিকে যেমন পর্যটন সম্ভাবনা অপূর্ণ থেকে যাচ্ছে, অন্যদিকে সরকারও সম্ভাব্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সৈয়দপুর থেকে ঘুরতে আসা মো. আরিফ হোসেন বলেন- পরিবার নিয়ে ঘুরতে এসেছিলাম। এত চমৎকার ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। ভেবেছিলাম সারা দিন ঘুরবো এক রাত থাকবো, কিন্তু এখানে থাকার কোনো ব্যবস্থা নেই। রূপপুর প্রকল্পটি কাছ থেকে দেখতে না পারলেও দূর থেকে দেখেছি। জায়গাটি খুব সুন্দর, তবে পর্যটকদের জন্য আরও সুযোগ থাকা দরকার। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি লোডিংয়ের এই ঐতিহাসিক সূচনা দেশের বিদ্যুৎ খাতে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করলো। উন্নয়ন ও অগ্রগতির ধারাবাহিকতায় এটি হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের জন্য এক গর্বের প্রতীক।-ম,জমিন

Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এ ক্যাটাগরীর আরো সংবাদ