আজ ৯ই শ্রাবণ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ, ২৪শে জুলাই, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

ঢাকায় শত শত সমিতি, কাজ কী?

(আজকের দিনকাল):রাজধানী ঢাকাকে কেন্দ্র করে কতোগুলো সমিতি রয়েছে তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান নেই। নামে বেনামে গড়ে ওঠা হাজারো সমিতির মধ্যে কিছুসংখ্যক জনকল্যাণে কাজ করলেও বাকিগুলো নামসর্বস্ব। এসব সমিতির অধিকাংশই নির্বাচন ও বাৎসরিক পিকনিককেন্দ্রিক। সদস্যদের স্বার্থ কিংবা সমাজসেবায় দৃশ্যমান কোনো কর্মসূচি থাকে না। সরকারি দপ্তর থেকে শুরু করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সব জায়গায় রয়েছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সমিতি। এ ছাড়াও সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন নাম দিয়েও চলে অসংখ্য সমিতির কার্যক্রম। সাংবাদিক সংগঠনসহ বিভিন্ন কমিউনিটির সমিতিও রয়েছে যেখানে সেখানে। কিছু কিছু সংগঠন নিজেদের অসহায় ও দুঃস্থ সদস্যদের পাশেও থাকেন। যদিও অভিযোগ আছে, কোনো কোনো সমিতির নেতারা চাঁদাবাজিতে জড়িত। সমিতির নাম ভাঙিয়ে তারা বিভিন্নভাবে অনৈতিক সুবিধা নিয়ে থাকেন।

তাই এসব সমিতির নির্বাচনে লাখ লাখ টাকা খরচও করেন নেতারা।
ঢাকায় সবচেয়ে বেশি কার্যকর সমিতি হচ্ছে জেলাভিত্তিক সমিতিগুলো। ঢাকাস্থ বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার নামে এসব সমিতির কার্যক্রম চলমান। এরমধ্যে উল্লেখযোগ্য সমিতির মধ্যে রয়েছে- জালালাবাদ সমিতি, চট্টগ্রাম সমিতি, বৃহত্তর বরিশাল সমিতি, ঢাকাস্থ দক্ষিণবঙ্গ কল্যাণ সমিতি, যশোর সমিতি, খুলনা সমিতি, রংপুর সমিতি, পটুয়াখালী সমিতি, ময়মনসিংহ সমিতি, নোয়াখালী সমিতি, কুমিল্লা সমিতি, কুষ্টিয়া সমিতি, রাজশাহী সমিতি, নাটোর সমিতি, ঠাকুরগাঁও সমিতি, ফেনী সমিতি, কিশোরগঞ্জ সমিতি ইত্যাদি। এসব সমিতির নেতৃত্বে আসতেও চলে বড় ধরনের প্রতিযোগিতা। ঢাকায় অবস্থানরত এসব এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়ানোর লক্ষ্যে ও জেলার সার্বিক উন্নয়নে কাজ করার উদ্দেশ্যে সমিতি গড়ে উঠেছে। তবে বিতর্কও রয়েছে অনেক সমিতি নিয়ে।

ঢাকাস্থ জালালাবাদ সমিতি সিলেট বিভাগের বাসিন্দাদের জন্য নানা কল্যাণমূলক কাজ করে থাকে। শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান, দুঃস্থদের সাহায্য ও চিকিৎসা খরচ বহনসহ নানা সামাজিক অনুষ্ঠান আয়োজন করে এ সমিতি। নাটোর জেলা সমিতি ঢাকার যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. মাহমুদুল হক খোকন বলেন, আমরা মূলত ঢাকায় অবস্থানরত নাটোর জেলাবাসীর মধ্যে একতা, ভ্রাতৃত্ব, সহযোগিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করে থাকি। ঢাকায় অবস্থানরত নাটোরের বাসিন্দাদের কল্যাণেই কাজ করা আমাদের লক্ষ্য। তবে আমাদের বাৎসরিক সবচেয়ে বড় প্রোগ্রাম হচ্ছে নাটোর জেলা উৎসব। যেটি শীত মৌসুমে অনুষ্ঠিত হয়। এ উৎসবে নাটোরের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেয়। এ ছাড়া ইফতার পার্টি করে থাকি। যাকাত বণ্টনসহ অসহায়দের পাশে দাঁড়াই। পাশাপাশি আমরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন সংবর্ধনারও আয়োজন করে থাকি।

ঢাকায় সাংবাদিকদেরই ঠিক কতোটি সমিতি রয়েছে তার কোনো হিসাব নেই। আবার যেসব সমিতি রয়েছে সেগুলোও ভাঙনে জর্জরিত। ঢাকাকেন্দ্রিক সাংবাদিকদের অসংখ্য সংগঠনের মধ্যে রয়েছে- বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, ঢাকা সাব-এডিটর কাউন্সিলসহ অসংখ্য সংগঠন। এ ছাড়াও বিটভিত্তিক সংগঠন রয়েছে অসংখ্য। আছে, জেলা ও বিভাগীয় সাংবাদিক সমিতি। আবার এসব সংগঠনে রয়েছে ভাঙন। একেকটি সংগঠন একাধিক সংগঠনে রূপ নিয়েছে। ঢাকার বিভিন্ন এলাকায়ও নামে বেনামে রয়েছে সাংবাদিক সংগঠন। তবে সাংবাদিকদের স্বার্থ নিয়ে এসব সংগঠনকে কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে দেখা যায় না। জানতে চাইলে ডিআরইউ সভাপতি সৈয়দ শুক্কুর আলী শুভ বলেন, আমরা কোনো সংগঠনের সদস্য হতে কাউকে বাধাও দেই না উৎসাহও দেই না। এটা যার যার অফিসের বিষয় কোন সংগঠনের সদস্য হতে দেবে বা দেবে না।

রাজধানীর বড় বড় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেন্দ্রিকও রয়েছে অসংখ্য সংগঠন। নামে বেনামে গড়ে ওঠা এসব সংগঠন নিয়ে বিতর্কও কম না। কোনো কোনো সংগঠনের কর্মকাণ্ড কমিটি গঠন ও বাৎসরিক একটি পিকনিকেই সীমাবদ্ধ। তাছাড়া কমিটি গঠনের সময় স্পষ্ট হয় কোন্দল। ঢাকার সবচেয়ে বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও ঠিক কতোগুলো সমিতি রয়েছে তার সঠিক হিসাব করা কঠিন। শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিয়ে গঠিত এসব সংগঠন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির পাশাপাশি শিক্ষকদের রয়েছে আরও তিনটি সংগঠন। আওয়ামীপন্থি শিক্ষকদের নীল দল, বিএনপি-জামায়াতপন্থি শিক্ষকদের সাদা দল এবং বামপন্থি শিক্ষকদের গোলাপী দল এখানে সক্রিয়। রয়েছে কর্মকর্তা সমিতি, কর্মকর্তা-কর্মচারী সমিতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রাজুয়েট সমিতি, ৩য় শ্রেণি ও ৪র্থ শ্রেণি কর্মচারী সমিতি ও কারিগরি সমিতির মতো অনেক সমিতি। এমনকি শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীদের রয়েছে এলাকাভিত্তিক অসংখ্য সংগঠন। যেমন- ফরিদপুর জেলা সমিতি, ঢাবি; বৃহত্তর বরিশাল সমিতি, ঢাবি; বৃহত্তর নোয়াখালী সমিতি, ঢাবি ইত্যাদি। শুধু কর্মচারীদেরও রয়েছে এলাকাভিত্তিক সংগঠন। এখানকার শিক্ষার্থীদেরও রয়েছে অসংখ্য সংগঠন। বিভিন্ন জেলা-উপজেলাকেন্দ্রিক এসব সংগঠনের বাইরে রয়েছে হলভিত্তিক বিভিন্ন বিভাগের সংগঠন। বিভিন্ন সময় এসব সংগঠন নিয়ে চলে কমিটি গঠন ও পাল্টা কমিটি গঠনের মতো ঘটনা। এ ছাড়াও কোনো কোনো সমিতির নেতাদের বিরুদ্ধে অর্থ আত্মসাৎ এর অভিযোগও আসে অহরহ। তেমনই একটি সংগঠন ঢাকা ইউনিভার্সিটি স্টুডেন্টস থ্রাইভিং এসোসিয়েশন অব রংপুর (ডিইউ-স্টার)। ২০১৮ সালে কমিটি গঠন নিয়ে তৈরি হওয়া অসন্তোষের কারণে বর্তমানে বন্ধ রয়েছে এর কার্যক্রম। তখনকার আহ্বায়ক কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক আব্দুর রাকিব বলেন, নেতৃত্ব বাছাইয়ে অনিয়ম ও গ্রুপিং এর কারণে দীর্ঘদিন সমিতি অকার্যকর হয়ে আছে। নেতারা বিভিন্ন প্রোগ্রামের নামে অর্থ আত্মসাৎ ও নানা অনিয়মে যুক্ত। সবার অংশগ্রহণমূলক না হওয়ায় কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া থমকে আছে দীর্ঘদিন। তাছাড়া সমিতিকেন্দ্রিক একটা সময়ে সাবেক-বর্তমানের মেলবন্ধন একেবারেই কমে যায়। সব মিলিয়ে একটা অসন্তোষ তৈরি হওয়া সমিতির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

ঢাকার বিভিন্ন এলাকাভিত্তিকও রয়েছে নানা সংগঠন। এসব সমিতি এলাকার মানুষের সুবিধা অসুবিধা দেখার পাশাপাশি বিভিন্ন দিবসে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। অনেক সময় স্বার্থের দ্বন্দ্বেও জড়াতে দেখা যায় এসব সংগঠনকে। ঢাকার এলাকাভিত্তিক সংগঠনগুলোর মধ্যে রয়েছে- রাজারবাগ শান্তি সংঘ, মহানগর সোসাইটি, প্রয়োজন ক্লাব, উত্তরণ যুব সংসদ, গুলশান সোসাইটি, পূর্ব রাজারবাগ সোসাইটি, মোহাম্মদপুর হাউজিং সোসাইটি, যুব উন্নয়ন সংসদ ঢাকা, বনানী সোসাইটি, জাতীয় তরুণ সংঘ ইত্যাদি। জানতে চাইলে আজিমপুরের ইরাকি মাঠ এলাকা যুব সংসদের সভাপতি নজরুল ইসলাম জানান, ১৯৫২ সালে প্রতিষ্ঠিত তাদের সংগঠন মূলত এলাকার মানুষের সুবিধা-অসুবিধায় পাশে থাকাতেই কাজ করে। সামাজিক কাজকর্মের মাধ্যমে এলাকার যুব সমাজকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে তারা কাজ করেন। তবে ১৯৮৪ সালে পাড়া ভাগ হয়ে গেলে যুব সংসদ ভাগ হয়ে যায়। তখন উত্তরণ যুব সংসদ দক্ষিণ পাড়া আলাদা হয়ে যায়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক এবং সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, সমাজে মানুষের চাহিদার ধরন ও পূরণ, বিভিন্ন সামাজিক সংকটে পরস্পর একত্রিত হয়ে মোকাবিলা করে সকলের স্বস্তি ও নিরাপদ জীবনের লক্ষ্যে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের অগ্রযাত্রা শুরু হয়। ঢাকায় বিভিন্ন নামে বহুবিধ লক্ষ্যকে জানান দিয়ে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো আত্মপ্রকাশ করে। তবে এ সমস্ত সংগঠনগুলোর কার্যবিধি সংগঠনের সদস্যদের ব্যক্তি চাহিদা পূরণে বেশি নিয়োজিত। সমাজের সমস্যাগ্রস্ত মানুষের অভাব পূরণ, সামাজিক দায়বদ্ধতার চর্চা, মানবিক উদাহরণ তৈরির ক্ষেত্রে নিজস্ব সক্ষমতা ও ভূমিকা মানুষের জন্য ব্যয় করার মানসিকতা থেকে এই সংগঠনগুলো দূরে সরে যাচ্ছে। একইসঙ্গে, ঢাকার অধিকাংশ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো নানাবিধ অনৈতিক, আইন বহির্ভূত, ও ব্যক্তি স্বার্থ চরিতার্থ করার কাজে নিয়োজিত। যে যেভাবে পারছে সেভাবে নিজেদের উদ্দেশ্য হাসিল করছে। এরূপ বৈশিষ্ট্য ধারণ করায় সংগঠনগুলো সাধারণ মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছে। অথচ সমাজ ও দেশের যেকোনো প্রয়োজনে অতীতে এই সংগঠনগুলোই মানুষকে সামাজিকভাবে আগলে রেখেছে এবং সাংস্কৃতিকভাবে স্বস্তির ভূমিকায় অবতীর্ণ করেছে। সময়ের ধারাবাহিকতায় অধপতনের প্রভাব এই সংগঠনগুলোর ওপরও পড়েছে। এই সংগঠনগুলোর নীতি বহির্ভূত নানা ধরনের কাজ নিজেদের ভাবমূর্তি নষ্ট করছে। সরকার ও অনুমোদনের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে এই ধরনের সংগঠনের অনুমোদনের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নীতিমালার অনুসরণ অপরিহার্য। এর সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে অভিযোগ ও সৃষ্ট অনিয়মের ভিত্তিতে অভিযান পরিচালনা করা এখন সময়ের দাবি।- মানবজমিন

Share

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     এ ক্যাটাগরীর আরো সংবাদ